প্রকাশের সময়: 29-03-2026 12:24:20 am
স্বাধীনতা কেবলমাত্র একটি শব্দ নয় বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির আত্মত্যাগ, সংগ্রাম আর গৌরবের ইতিহাস। ২৬ মার্চ এলে সেই ইতিহাস নতুন করে নাড়া দেয় প্রতিটি হৃদয়ে। স্বাধীনতার এই মাহেন্দ্রক্ষণ শুধু অতীত স্মরণ করার দিন নয়, বরং বর্তমানকে মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎকে গড়ে তোলার প্রেরণাও বটে।
এই প্রেক্ষাপটে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের মনেও স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে তৈরি হয় নানা ভাবনা, প্রত্যাশা ও উপলব্ধি। কেউ স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ খোঁজেন সামাজিক ন্যায়বিচারে, কেউবা উন্নত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নে। আবার কারও কাছে স্বাধীনতা মানে নিজের মত প্রকাশের অধিকার, নিরাপদ জীবনযাপন ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা। তরুণ প্রজন্মের এই বহুমাত্রিক চিন্তা-চেতনার মধ্য দিয়েই প্রতিফলিত হয় স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য।
স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পূর্ণ করে , পঞ্চান্ন একরের ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে গোবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা কিভাবে দেখছে দেশ, সমাজ ও নিজেদের ভূমিকা—সেই ভাবনাগুলোই তুলে ধরেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোঃ ইসতিয়াক আহম্মদ আসিফ।
" স্বাধীনতার চেতনায় গড়ে উঠুক দায়িত্বশীল প্রজন্ম "
স্বাধীনতা আমাদের জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। এই লাল-সবুজ পতাকার প্রতিটি সুতোয় মিশে আছে লাখো শহীদের রক্ত, অগণিত মা-বোনের আত্মত্যাগ আর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতা। ২৬শে মার্চ কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি লাল তারিখ নয়; বরং এটি আমাদের আত্মপরিচয় ঘোষণার দিন, গভীর শ্রদ্ধা আর আত্মসমালোচনার এক বিশেষ মহেন্দ্রক্ষণ। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, স্বাধীনতার প্রকৃত সার্থকতা শুধু একটি ভূখণ্ড বা মানচিত্র পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ নিহিত আছে শৃঙ্খলমুক্ত চিন্তা, সৃজনশীলতার বিকাশ এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অদম্য প্রেরণার মাঝে।
আজকের তরুণ প্রজন্ম হিসেবে আমাদের ওপর অর্পিত হয়েছে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। আমাদের কাজ শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়, বরং সেই বীরত্বগাথা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হওয়া। দুর্নীতি, বৈষম্য ও যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকাই হতে পারে আমাদের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান প্রদর্শন। আমাদের প্রাত্যহিক শিক্ষা, চিন্তা আর কর্মে যদি স্বাধীনতার এই চেতনা প্রতিফলিত হয়, তবেই দেশ কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। শহীদদের স্বপ্নের সেই সোনার বাংলা গড়ার গুরুভার আজ আমাদেরই কাঁধে। আমরা যদি নিজেদের দক্ষ, সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তবেই স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা পাবে। তাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধকে পাথেয় করে আমাদের কাজ করে যেতে হবে। আমাদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নিশ্চিত করবে। রক্তে কেনা এই স্বাধীনতার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।
— আরিজ বিনতে হাবিব
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ।
" শহীদের রক্তের ঋণ: কথায় নয়, কাজে প্রমাণের সময় "
এই দিনে খুব করে স্মরণ হয় মহান স্বাধীনতায় প্রাণ দেয়া বীর শহীদদের সহ এই ভূখন্ডের শুরু থেকে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া মানুষগুলোকে। যাদের আত্মত্যাগের ফল এই বাংলাদেশ। আমার দৃষ্টিতে স্বাধীনতা শব্দটি কেবল অর্জনের বিষয় নয় বরং তা চলমান একটি বিষয়। যে জাতি যতো সচেতন ততো বেশি এর স্থায়ীত্ব। আমাদের হয়তো সচেতনতা এই ভূখন্ডের সার্বভৌমত্বের জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না। যার ফল হিসেবে আমরা পর্দার আড়ালে আধিপত্যবাদি অস্তিত্ব বিরোধী কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হই। আমাদের পাল্লা গুলো ব্যালান্সড থাকেনা। ভদ্র সুশীল সমাজ দেশ প্রেমে আবেগ ঢেলে দিলেও ডিপস্টেট আধিপত্যবাদের ঝর রুখার কোন ঢাল তাদের নেই। আমাদের স্বাধীনতার চেতনার বুলি আওড়াতে যতোটা আগ্রহী থাকি তার লালন-ধারনে কিংবা হুমকি ঠেকাতে ততোটা আগ্রহী থাকি না। ঔপনিবেশবাদ বিরোধী কন্ঠস্বর তিতুমীর, মাস্টার দ্যা সূর্য সেন থেকে সূচিত হওয়া সার্বভৌমত্বের অর্জনের আন্দোলন সাতচল্লিশ পেরিয়ে একাত্তরে এসে আমাদের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। যে দায়িত্ব দফায় দফায় অবহেলিত হচ্ছে। শহীদ আবরার-জুলাই-হাদি এপথের নতুন দিশা নতুনভাবে চিহ্নিত করে দেয়। এই দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের পর্যাপ্ত সাহসী ও যোগ্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এ প্রজন্মের মৌলিক দাবিতে পরিণত হয়েছে।
— আরাফাত আলম
ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ।
" স্বাধীনতা দিবস কেবলমাত্র আনন্দের উপলক্ষ নয় বরং আত্মসমালোচনার সময় "
স্বাধীনতা শব্দটি একটি জাতির সর্বোচ্চ অর্জন এবং সেই অর্জনের পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ত্যাগ সংগ্রাম ও আত্মদানের ইতিহাসকে ধারণ করে।আমি মনে করি স্বাধীনতা দিবস আমাদের জন্য শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয় বরং এটি আত্মসমালোচনা ও দায়িত্ববোধ যাচাই করে দেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। স্বাধীনতা দিবস শুধুমাত্র পতাকা উত্তোলন বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, দিবসটিকে আমাদের জাতীয় চেতনা ও মূল্যবোধকে নতুন করে উপলব্ধি করার সময়ে পরিনত করার চেষ্টা করা উচিত। প্রকৃত স্বাধীনতা শব্দটি তখনই অর্থবহ হবে যখন আমরা নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবো এবং দেশের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারব। বর্তমানের এই দুর্নীতি, বৈষম্য ও সাসামাজিক অবক্ষয়ে জর্জরিত দেশে স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের কাধে দায়িত্বের ভার আরো বেশি।আমাদের একাডেমিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ অর্জনের দিকেও সচেতন হতে হবে। মহান স্বাধীনতা দিবস ২০২৬ আমাদের হয়তো আরো একবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে যাবে যে স্বাধীন জাতি হিসেবে অর্ধ শত বছরেরও বেশি সময় পার করার পরও আমাদের দায়িত্ব কিছু অংশে কমে যায় নি বরং দেশকে রক্ষা করতে, দেশের মানুষের সার্বিক কল্যানে আমাদের মানবিক মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া অতি জরুরি হয়ে দাড়িয়েছে। সর্বোপরি ২৬ শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে স্মরণ করি এযাবৎ কালীন সকল শহীদদের যারা তাদের মূল্যবান প্রাণের বিনিময়ে দেশের মানুষের কল্যাণ চেয়ে গেছেন। তাদের অনুসরণে স্বপ্নের বৈষম্যহীন, ন্যায় ও মানবতার বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গিকার।
— ফারিয়া বিনতে ফিরোজ
ইংরেজি বিভাগ, ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষ।
" স্বাধীনতা আমাদের অহংকার, আর তারুণ্য আমাদের শক্তি "
বাঙালির ইতিহাসে ২৬শে মার্চ কেবল একটি তারিখ নয় , বরং এটি এক অবিনাশী চেতনার নাম। ১৯৭১ সালের এই দিনে যে অগ্নিমশাল প্রজ্বলিত হয়েছিল, তার নাম ‘স্বাধীনতা’। আজ কয়েক দশক পেরিয়ে এসে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় দাঁড়িয়ে যখন পেছনে তাকাই, তখন রক্তক্ষয়ী সেই নয় মাসের সংগ্রাম আর লাখো প্রাণের আত্মদান আমাদের ভেতরে এক অদ্ভুত স্পন্দন তৈরি করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রজন্মে দাঁড়িয়ে আমরা স্বাধীনতাকে কীভাবে দেখছি? আমাদের কাছে স্বাধীনতা কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র বা লাল-সবুজের পতাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতা মানে মুক্তচিন্তার অবারিত আকাশ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে সোচ্চার হওয়ার সাহস এবং বৈষম্যহীন এক ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়ার স্বপ্ন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা চব্বিশের উত্তাল জুলাই বিপ্লব, সবখানেই তারুণ্য তার বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ন্যায়ের জয়গান গেয়েছে। আজকের তারুণ্যও সেই একই সাহসে বলীয়ান, একই সংকল্পে অবিচল। আমরা বিশ্বাস করি, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা যেমন কঠিন, তেমনি একে সার্থক করাও একটি নিরন্তর যুদ্ধ। স্বাধীনতা আমাদের অহংকার, আর তারুণ্য আমাদের শক্তি। অতীতের চেতনা ও বর্তমানের সাহসকে পাথেয় করে আমরা এগিয়ে যেতে চাই একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে। যে বাংলাদেশে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ প্রতিফলিত হবে মানুষের জীবনে, চিন্তায় ও কাজে।
— মোঃ মিরাজুল ইসলাম
ইতিহাস বিভাগ, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ।
সর্বোপরি, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে আজকের বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই ও অর্থবহ করতে হলে প্রয়োজন সচেতন, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক।
গোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় প্রতিফলিত হয়েছে সেই প্রত্যাশা—একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার।
১ দিন ৪ ঘন্টা ১২ মিনিট আগে
৪ দিন ১৯ ঘন্টা ০ মিনিট আগে
৯ দিন ১৪ ঘন্টা ০ মিনিট আগে
১০ দিন ১৫ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে
১৩ দিন ১০ ঘন্টা ৪৫ মিনিট আগে
১৫ দিন ২৩ ঘন্টা ২৫ মিনিট আগে
১৬ দিন ৭ ঘন্টা ৫৬ মিনিট আগে
১৮ দিন ১৯ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে