পানিই জীবন—এই কথা সবাই জানি। বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজনীয়তা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরিহার্য। কিন্তু সেই পানিই যদি হয় জীবাণুযুক্ত, অস্বাস্থ্যকর বা প্রতারিতভাবে বাজারজাত, তাহলে সেটি জীবন বাঁচানোর বদলে মৃত্যুঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। ঠিক এমনই এক ভয়াবহ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে সাতক্ষীরাবাসী।
বর্তমানে সাতক্ষীরা শহর ও এর আশপাশের এলাকায় বিস্ময়কর হারে বেড়ে চলেছে তথাকথিত ‘ড্রিংকিং ওয়াটার’ ব্যবসা। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগেরই নেই সরকারি অনুমোদন বা মান নিয়ন্ত্রণের কোনো বৈধতা। জানা গেছে, জেলার প্রায় ৫০টির বেশি ড্রিংকিং ওয়াটার কোম্পানি বিএসটিআই অনুমোদন ছাড়াই পানি বাজারজাত করছে। এদের মধ্যে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই operates in broad daylight, জনগণের চোখের সামনে, প্রশাসনের নজরের আড়ালে।
অনুমোদনহীন পানি, তবুও বীরদর্পে ব্যবসা:
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ড্রিংকিং ওয়াটার কোম্পানিকে পানি বাজারজাত করতে হলে নির্ধারিত মান অনুযায়ী বিশুদ্ধকরণ, ল্যাব টেস্ট ও বিএসটিআই’র সনদপত্র বাধ্যতামূলক। কিন্তু সাতক্ষীরার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই এই নিয়মকে একপ্রকার উপহাস করে চলছে।
বিএসটিআই খুলনা বিভাগীয় অফিস একাধিকবার অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে। অভিযানে ধরা পড়া কিছু প্রতিষ্ঠান হলো:
চিশতিয়া ড্রিংকিং ওয়াটার (আমতলা মোড়),
সৌদিয়া ড্রিংকিং ওয়াটার,
হালাল ড্রিংকিং ওয়াটার।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, তারা প্রতিবারই মুচলেকা দিয়ে আবারো ব্যবসায় ফিরে আসে। বিশেষ করে চিশতিয়া ও সৌদিয়া ড্রিংকিং ওয়াটার প্রতিষ্ঠান এখনো দম্ভের সাথে অননুমোদিত ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, যেন আইন-কানুন তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়।
সাতক্ষীরায় মাত্র ৫টি বৈধ প্রতিষ্ঠান:
বিএসটিআই অনুমোদনপ্রাপ্ত ড্রিংকিং ওয়াটার কোম্পানি সাতক্ষীরায় মাত্র ৫টি। এগুলো হল:
১. রিমঝিম ড্রিংকিং ওয়াটার।
২. তাহা ড্রিংকিং ওয়াটার।
৩. হক ড্রিংকিং ওয়াটার।
৪. ঋশিল্পী ড্রিংকিং ওয়াটার।
৫. উত্তরণ ড্রিংকিং ওয়াটার।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পানি বিশুদ্ধকরণ, ল্যাব টেস্ট এবং মান রক্ষা করে পানি সরবরাহ করে। কিন্তু অনুমোদনহীন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কোনও ধরণের পরীক্ষাও করে না, নেই ফিল্টার, নেই UV বা RO সিস্টেম। এদের পানির উৎস শুধু চাপ কল বা গভীর নলকূপ, যেখানে গিয়ে সরাসরি পানির বোতল ভর্তি করে বাজারজাত করা হয়।
ভ্যানচালকদের হাতে পানি ব্যবসা!
এদের অনিয়ম এখানেই শেষ নয়। দেখা গেছে, এসব অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা নিজেরা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় থাকেন না। বরং পানি বিক্রির মূল দায়িত্ব দেন ইঞ্জিনচালিত ভ্যানচালকদের হাতে।
প্রতিটি ২০ লিটারের জার তারা কিনে নেয় ৫-৮ টাকায় এবং এরপর সেটি বাজারে বিক্রি করে ৩০-৩৫ টাকায়। এতে একদিকে যেমন পানির গুণগতমান নিশ্চিত থাকে না, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ দামে ঠকেন, স্বাস্থ্যেও পড়ছে বিপরীত প্রভাব।
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে কোমলমতি শিক্ষার্থী ও রোগীরা:
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, সাতক্ষীরার অনেক নামী হাসপাতাল, ক্লিনিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই অননুমোদিত পানির সরবরাহ চলছে দিনের পর দিন। এর মধ্যে রয়েছে:
ন্যাশনাল ক্লিনিক, আনোয়ারা ক্লিনিক, বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
এবং যে প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ করছে তারা হলো: ঝর্ণা ড্রিংকিং ওয়াটার, বর্ষা ড্রিংকিং ওয়াটার, পিপাসা ড্রিংকিং ওয়াটার, অনির্বাণ ড্রিংকিং ওয়াটার।
এইসব প্রতিষ্ঠানের পানি সাধারণত খোলা জায়গায়, টিনের বড় ড্রামে সংরক্ষণ করা হয়, যা প্রচণ্ড গরমে ও নোংরা পরিবেশে দূষিত হয়ে পড়ে। ছোট ছোট শিশু, ক্লান্ত রোগী কিংবা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
অনির্বাণ ড্রিংকিং ওয়াটার ভুয়া লোগো দিয়ে প্রতারণা:
সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতারণা করছে অনির্বাণ ড্রিংকিং ওয়াটার। প্রতিষ্ঠানটির বিএসটিআই অনুমোদন নেই, অথচ বোতলে প্রকাশ্যে বিএসটিআই লোগো ব্যবহার করছে, যা আইনত সম্পূর্ণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এটি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
প্রশাসনের নীরবতা ও দায় এড়াতে পারে না:
প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকাশ্যে প্রতারণা করে যাচ্ছে অথচ স্থানীয় প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে কিছু টাকা জরিমানা করলেই দায়িত্ব শেষ মনে করছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজন।
নিয়মিত ও কঠোর অভিযান:
অনুমোদনবিহীন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল ও কারখানা সিলগালা।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পানির বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ।
শেষ কথা:
সাতক্ষীরাবাসী এখন একটাই প্রশ্ন করছে—
“আমরা আসলে কী খাচ্ছি? পানি না বিষ?”
যে পানি বিশুদ্ধ হওয়ার কথা, সেটিই যদি জীবাণু, ফিটকিরি, শেওলা বা কলের জলের সঙ্গে মিশে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি?
সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা এবং এরপর প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ। পানি ব্যবসা কোনো খেলার বিষয় নয়—এটি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
৩ দিন ১১ ঘন্টা ২১ মিনিট আগে
১১ দিন ১৫ ঘন্টা ৪৬ মিনিট আগে
১১ দিন ১৬ ঘন্টা ১৮ মিনিট আগে
১২ দিন ১২ ঘন্টা ৪০ মিনিট আগে
১২ দিন ১২ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে
১৩ দিন ৯ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে
১৩ দিন ১৬ ঘন্টা ৫২ মিনিট আগে
১৩ দিন ২২ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে