আষাঢ় মাসের সূচনা মানেই বাংলার জনপদে রথযাত্রার প্রস্তুতি। শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথের চাকা শুধু পাথরে গড়া রথ টেনে নিয়ে যায় না,টেনে নিয়ে যায় হাজার বছরের বিশ্বাস, শেকড়ের স্মৃতি আর ভক্তিমগ্ন বাঙালির আবেগ। রথ যেন সেতুবন্ধন গড়ে তোলে মানুষের অন্তর ও ঈশ্বরের মাঝে।পুরাণ বলে, উড়িষ্যার রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে জগন্নাথদেবের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন সমুদ্রতীরে ভেসে আসা নিম কাঠ দিয়ে। এই মূর্তির চোখ বড়, হাত গুটানো, মুখে চিরসন্তুষ্টির হাসি বিষ্ণুর গোপন লীলার প্রতিচ্ছবি। রানীর আগ্রহে মূর্তি তৈরির মাঝপথে থেমে যাওয়ার ঘটনাই আজকের জগন্নাথ দেবের রূপের পেছনে কাহিনির উৎস।শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রার রূপক মূর্তি এই রথযাত্রায় হয়ে ওঠে ভক্তির চলমান প্রতীক। পুরীতে তিন রথে হয় যাত্রা প্রথমে বলরাম, তারপর সুভদ্রা, শেষে জগন্নাথ। রাজা অনঙ্গ ভীমদেব ১২শ শতকে তিন রথের প্রথা শুরু করে।“এই দেহ রথ, আর আত্মা সেই রথের সারথি”এই উপনিষদীয় বাণী রথযাত্রার মর্মকথা বলে দেয়। রথ টানার দড়িতে হাত রাখা মানে শুধু ঐতিহ্যের টান নয়, তা এক আত্মিক টান, ভগবানের সান্নিধ্যে নিজেকে সমর্পণের চেষ্টা।
শ্রীমদ্ভাগবত মতে, যারা রথযাত্রায় অংশ নেয় বা দড়ি টানে, তাদের জীবনে আসে পুণ্যফল ও ঈশ্বরকৃপা। বহু ভক্ত বিশ্বাস করেন এই দিনে করা প্রার্থনা কখনো ব্যর্থ হয় না।সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় প্রতি বছর রথযাত্রা ঘিরে এক প্রাণবন্ত উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। বুধহাটা, খাজরা, কাদাকাটি, শ্রীউলা, আনুলিয়া প্রতিটি গ্রামে রথ টানা শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং একটি মিলনমেলা। এই উৎসবে অংশ নিয়ে দেখায় মানবিক সহাবস্থানের সৌন্দর্য।রথকে ঘিরে বসে বর্ণিল মেলা।মেলায় প্রচুর কলা ও লটকন বিক্রি হয়, যা রথের সাথে লোকবিশ্বাসে জড়িত। শিশুদের জন্য পুতুল, বাঁশের বাঁশি, কাঠের খেলনা মাটির হাঁড়ি, ঠাকুরঘর, পিতলের তৈজস মিষ্টিজাত খাবার: জিলাপি, খই, চিড়া, আমিত্তি এই মেলাই যেন হয়ে ওঠে গ্রামীণ জীবনের ক্ষণিকের রূপবৈচিত্র্য।
রথ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এক চলমান দর্শন রথ মানে এগিয়ে চলা, দাঁড়িয়ে না থাকা। ঠিক যেমন জীবনের প্রতিটি পর্বে মানুষ ঈশ্বরের পথ অনুসরণ করে এগিয়ে চলে। রথযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঈশ্বর বহির্জগতে নয়,তিনি অন্তরে বিরাজমান।এই সময়টা শুধুই শোভাযাত্রা বা আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি হৃদয়ের উৎসব। রথের চাকা যেমন ঘুরে চলে, তেমনি মানুষও এগিয়ে চলে বিশ্বাস, ভালোবাসা আর আত্মার আরাধনায়।রথ টানার সেই দড়ির সঙ্গে আমরা যেন টেনে নিই মানবিকতা, সহনশীলতা ও আন্তরিকতার বন্ধন।রথ নয়, এ এক যাত্রা নিজেকে ছুঁয়ে ঈশ্বরকে ছোঁয়ার।(সচ্চিদানন্দদে সদয়,সংবাদ কর্মী)
৮ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে
২ দিন ৮ ঘন্টা ৩০ মিনিট আগে
৬ দিন ৮ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে
৮ দিন ৭ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে
১৪ দিন ৮ ঘন্টা ৮ মিনিট আগে
১৭ দিন ৭ ঘন্টা ৫৯ মিনিট আগে
১৯ দিন ৮ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে