শ্রীমঙ্গলে রিসোর্টে গোপনে গেস্টের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করা সেই মেঘমালতি এখন বেলাশেষে রিসোর্ট
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাধানগর এলাকায় অবস্থিত আলোচিত সেই মেঘমালতি হোম স্টে রিসোর্টের নাম পরিবর্তন করে এখন বেলাশেষে রিসোর্ট রাখা হয়েছে। নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গতকাল রাতে প্রকাশ পাওয়ার পর নেটিজেন এবং স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে গত ৮ জুলাই এ রিসোর্টে বেড়াতে আসা গেস্টের আপত্তির ভিডিও-ছবি রিসোর্টে গোপনে ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠে। এসময় ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। শ্রীমঙ্গলের সার্বিক পর্যটন খাতের ভাবমূর্তি রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দারা ও পর্যটন উদ্যোক্তারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। শ্রীমঙ্গল রির্সোট মালিক সমিতিও প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনকে অনুরোধ করেন।
জানা যায়, গত ৮ জুলাই মৌলভীবাজারের এক যুবক-যুবতী ঘেমালতি হোম স্টে রিসোর্টের একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে রাত্রীযাপন করেন। পরে রিসোর্টের কক্ষের ভেতরে তাদের আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে ওই যুবকের হোয়াটসঅ্যাপে দেয়া হয়। মুহুর্তেই ধারনকৃত সেই আপত্তিকর ভিডিও নানা স্ট্যাটাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ব্ল্যাকমেইল করে চাঁদাবাজির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় রিসোর্টে কক্ষ ভাড়া নেয়া যুবক অপূর্ব সূত্রধর শ্রীমঙ্গল থানায় একটি অভিযোগ দেন বলে গণমাধ্যমকর্মীকে নিশ্চিত করেন। অভিযোগে অপূর্ব বলেন, তিনি তার প্রেমিকাকে নিয়ে ৮ জুলাই রিসোর্টের ১০৫ নম্বর কক্ষে থাকেন। রিসোর্টের ম্যানেজার সব জেনেই তাদের কক্ষ বরাদ্দ দেন। পরদিন ৯ জুলাই তারা রিসোর্ট ছেড়ে চলে আসার সময় তার হোয়াটসঅ্যাপে তাদের আপত্তিকর ছবি দিয়ে মোটা অঙ্কের টাক দাবি করে মেসেজ দেওয়া হয়। টাকা না দিলে ধারনকৃত ছবি ও ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল করে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। তিনি এর প্রতিকার চাইতে গেলে রিসোর্টের কয়েকজন তাকে মারধর করেন।
রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, ৮ জুলাই এক যুবক ও যুবতী রিসোর্টে আসেন। পরে রিসোর্টের কক্ষের ভেতরে তাদের আপত্তিকর ভিডিও কে-বা কারা ধারণ করে হোয়াটসঅ্যাপে ওই যুবককে প্রেরণ করেন। তবে যে নম্বর থেকে ভিডিও পাঠানো হয়েছে সে নম্বরটি তাদের কারো নয়। তিনি বলেন, যারা তার গেস্টের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা করেছে তাদের এবং যারা তার কাছে চাঁদা দাবি করেছে তাদেরও বিচার দাবি করেন। নাম পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি গতকাল বাড়িতে চলে এসেছি মালিক পক্ষ নাম পরিবর্তন করেছে মনে হয় বিষয়টি আমি পুরোপুরি জানি না।
রাধানগর মাদক বিরোধী টিমের সদস্য হাফেজ আবুল হাসেম বলেন, আমাদের গ্রামটি এখন পর্যটন নগরী। পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের সবার। কিন্তু রিসোর্টের ভেতরে গেস্টকে জিম্মি করে ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা নিন্দনীয়। এছাড়া আলোচিত ঘটনাটি ভাইরাল হওয়ার পর আইনি পদক্ষেপ বা স্পষ্ট ব্যাখ্যার মুখোমুখি না হয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ তাদের মূল ফেসবুক পেজটি প্রথমে ডিঅ্যাক্টিভ করে দেয় এবং পরবর্তীতে ব্যবসায় সচল রাখতে ওই রিসোর্টটির নাম পরিবর্তন করে নতুনভাবে প্রচারণা শুরু করে, মানে অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা। এ ধরনের অপকর্ম শ্রীমঙ্গলের সার্বিক পর্যটন খাতের সুনামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শ্রীমঙ্গল আবাসন সেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রির্সোটের মালিক সেলিম আহমেদ বলেন, যে রির্সোটে এই ঘটনাটি ঘটেছে সেটি আমাদের মূলধারার কোন রিসোর্ট নয়। তবুও যেভাবে প্রচার প্রচারনা হয়েছে এর প্রভাব সামগ্রিক পর্যটনের জন্য শুভনীয় নয়। স্থানীয় প্রশাসন ও সুশীল সমাজের উচিত এগুলো প্রতিরোধে এগিয়ে আসা। বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশের শ্রীমঙ্গল জোনের ওসি মো. কামরুল ইসলাম চৌধুুরী বলেন, এ বিষয়ে আমাদের নিকট কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেনি। আর এটি থানা পুলিশের বিষয়। আমরা অভিযোগ গ্রহণ বা তদন্ত করতে পারি না। শ্রীমঙ্গল থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমরা কোন পক্ষ থেকেই কোনো অভিযোগ পাইনি। রিসোর্টে নাম পরিবর্তন হয়েছে কি না সেটা আমার জানা নেই।
এদিকে শ্রীমঙ্গলের পর্যটন খাতের জন্য এই ঘটনাটি সাম্প্রতিক সময়ে একটি বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তীব্র সমালোচনা, নেতিবাচক রিভিউ ও বয়কটের মুখে পড়ে রিসোর্টটি। অবশেষে প্রায় ১৭ দিন পর অভিযুক্ত রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ তাদের রিসোর্টের নাম পরিবর্তন করে নতুন করে আলোচনায় আসে। অপরাধ ঢাকতে বা সমালোচনার মুখ থেকে বাঁচতে নাম পরিবর্তনের এই কৌশল নেটিজেন এবং স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আরও বেশি ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নাম পরিবর্তন করে অপরাধ ঢাকা সম্ভব নয়। বরং এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থার পাশাপাশি রিসোর্টে সার্বিক নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গলের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং ভ্রমণপিপাসুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনতিবিলম্বে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো রিসোর্টে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।