মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা-এ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বাঁশের আবাদ। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নতুন নতুন বাঁশঝাড় গড়ে উঠছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ১২০ হেক্টর জমিতে বাঁশের চাষ হচ্ছে। পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষায় বাঁশের গুরুত্ব বাড়ায় অনেক কৃষক নতুন করে এ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তবে ব্যবহার কমে যাওয়ায় উৎপাদনের তুলনায় বাজার সংকুচিত হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
একসময় শিবচরের বাঁশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন ছিল। বিশেষ করে বাশকান্দি, খানকান্দি, উমেদপুর, ভান্ডারীকান্দি ও ভদ্রাসন এলাকার বাঁশের ছিল আলাদা সুনাম। নদীপথে বরিশাল এবং সড়কপথে ঢাকার মগবাজার ও টঙ্গীর বড় বড় আড়তে যেত এ এলাকার বাঁশ। পানের বরজ, ঘরবাড়ি নির্মাণ, কৃষিকাজ, হাট-বাজারের দোকানঘর—সব ক্ষেত্রেই বাঁশ ছিল অপরিহার্য উপাদান।
গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে বাঁশের সম্পর্ক বহু পুরোনো। বাঁশ দিয়ে তৈরি হতো ওড়া, ঝাঁকা, কুলা, চালুন, পলোসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী। গৃহ নির্মাণ থেকে শুরু করে গয়ালঘর, সাঁকো কিংবা কৃষিকাজ—সবখানেই ছিল বাঁশের ব্যবহার।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক, স্টিল ও আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়তে থাকায় কমেছে বাঁশের কদর। আগের মতো বিক্রি নেই ওড়াবাঁশ কিংবা বরড়া বাঁশেরও। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর আগেও একটি বড় বাঁশ ভালো দামে বিক্রি হতো। এখন সেই দাম অনেকটাই কমে গেছে। অন্যদিকে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলে উৎপাদন বাড়লেও আশানুরূপ লাভ পাচ্ছেন না কৃষকেরা।
স্থানীয় কয়েকজন চাষি বলেন, বাঁশের আবাদে খরচ তুলনামূলক কম হলেও বাজার সংকটের কারণে অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। ব্যবহার কমে যাওয়ায় বাঁশ বিক্রি নিয়ে হতাশা বাড়ছে। তবুও দীর্ঘমেয়াদে লাভ এবং পরিবেশগত উপকারের কথা বিবেচনা করে অনেকেই বাঁশঝাড় ধরে রাখছেন।
তবে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মাঝেও পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষায় বাঁশের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। কৃষিবিদদের মতে, বাঁশ দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদ হওয়ায় এটি অল্প সময়েই বড় হয়ে ওঠে এবং প্রচুর কার্বন শোষণ করতে সক্ষম। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে বাঁশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া বাঁশঝাড় মাটির ক্ষয়রোধ করে, নদীভাঙন কমাতে সহায়তা করে এবং গ্রামীণ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় প্রাকৃতিক সুরক্ষা বেষ্টনী হিসেবেও কাজ করে বাঁশ। পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল হিসেবে বিশ্বব্যাপী বাঁশের চাহিদাও ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, “বাঁশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষায় বাঁশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকেরা পরিকল্পিতভাবে বাঁশ চাষ করলে লাভবান হতে পারেন।”
স্থানীয়দের মতে, বাঁশভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তোলা, আধুনিক নকশার বাঁশজাত পণ্য উৎপাদন এবং সরকারি সহায়তা বাড়ানো গেলে আবারও ফিরতে পারে বাঁশ শিল্পের পুরোনো ঐতিহ্য। একই সঙ্গে সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান।
গ্রামবাংলার মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাঁশ আজও হারিয়ে যায়নি। জন্ম থেকে শেষ বিদায় পর্যন্ত গ্রামীণ জীবনের নানা প্রয়োজনের নীরব সঙ্গী এই বাঁশ। তাই পরিবেশ, জলবায়ু ও গ্রামীণ অর্থনীতির স্বার্থে বাঁশ চাষ ও বাঁশশিল্প টিকিয়ে রাখতে এখনই প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
১ ঘন্টা ০ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ১৯ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ২০ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ২৫ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৩৯ মিনিট আগে