জামালপুরের ইসলামপুরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের গৃহীত কাজের বিনিময়ে 'খাদ্যশস্য' (কাবিখা) প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও শেষ হয়নি কাজ। এনিয়ে সংশ্লিষ্টদের একেকজন বলছেন—একেক কথা। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) বলছেন— কাজ চলমান। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দাবি, যথাযথভাবে কাজ হয়ে থাকলে; বিল না দিতে পিআইওকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতিদের ভাষ্য, কয়েক মাস আগেই কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শতভাগ বিলও উত্তোলন করেছেন তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নামমাত্র কাজ করে সরকারি বরাদ্দের চাল-গম লুটপাট করা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে,
২০২৫-২৬ অর্থ বছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে কাবিখা কর্মসূচির আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে এ উপজেলায় ৪৮ মেট্রিক টন ৩২০ কেজি চাল এবং
৩৮ মেট্রিক টন ৬৮০ কেজি গম বরাদ্দ আসে। এরমধ্যে চালের বিপরীতে আটটি এবং গমের বিপরীতে পাঁচটি প্রকল্প গ্রহণ করে গত ফেবুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কাজ শুরু করা হয়। কাজ তদারকি করেন ইউএনও নামজুল হুসাইন। ইতিমধ্যে তিনি বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। গত ৩০ জুন প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বেলগাছা ইউনিয়নের মিয়াপাড়া তাঁরা শেখের বাড়ি থেকে নজরুল মিস্ত্রীর বাড়ির অভিমুখে রাস্তা পুননির্মাণে ৫ মেট্রিক টন ৫৫০ কেজি চাল বরাদ্দের প্রকল্পে কাজ হয়েছে নামমাত্র।
স্থানীয় বাসিন্দা হেলাল এবং আকবর বলেন, 'মাহিন্দ্র গাড়ি ব্যবহারে কাজ করা হয়েছে। ২৫-৩০ গাড়ি মাটি রাস্তায় দেওয়া হয়। এতে বরাদ্দের অর্ধেক চালও ব্যয় হয়নি।'
প্রকল্পের সভাপতি ও বেলগাছা ইউপির সদস্য বাবুল আকন্দ বলেন, 'চেয়ারম্যান সাহেবের দিকনির্দেশনায় কাজ করা হয়েছিলো। পিআইও সুমন স্যার কাজ দেখছে। তারঁ মতো সৎ পিআইনও জীবনে দেখিনি। রাস্তা বৃষ্টিতে ভেঙে গেছে।'
বেলগাছা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, 'ইউএনও নামজুল হুসাইন স্যারের কথা মতো কাজ করতে গিয়ে বরাদ্দের চেয়ে বেশি ব্যয় করা হয়েছে। পিআইও সুমন সাহেব অন্ত্যন্ত সৎ অফিসার। অনিয়ম-দুর্নীতির প্রশ্নই ওঠে না।'
চিনাডুলী ইউনিয়নের পূর্ব বামনা আছাদ আলীর পুকুরপাড় হতে আব্দুস ছালামের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পুননির্মাণে ৫ টন ৫৩০ কেজি চাল বরাদ্দ হয়। এতে তেমন কোনো কাজ হয়নি।
প্রকল্পটির সভাপতি কে? এমন প্রশ্নের জবাবে চিনাডুলী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম বলেন, 'হয়তো আমি সভাপতি, না হয় মহিলা মেম্বার। কাজ ঠিকঠাক মতই করা হয়েছে।'
পরবর্তী সময়ে জানা যায়, ইউপি চেয়ারম্যান নিজেই প্রকল্পটির সভাপতি।
পাথর্শী ইউনিয়নের হাড়িয়াবাড়ি পূর্বপাড়া স্বাধীনের বাড়ি হতে তিন রাস্তার মোড় পর্যন্ত রাস্তা এইচবিবিকরণে ৭ টন ২৭০ কেজি চাল বরাদ্দ আসে।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল এবং মিজান বলেন, 'প্রকল্পটিতে অর্ধেক চাল ব্যয় করে বাকি চাল আত্মসাত করা হয়েছে।'
প্রকল্পটির সভাপতি ও পাথর্শী ইউপি সদস্য ফুলু শেখ বলেন, 'ইউপি চেয়ারম্যান সাহেবের পরামর্শে কাজ করা হয়েছে। কাজ সম্পর্কে চেয়ারম্যান ভালো জানেন।'
পাথর্শী ইউপি চেয়ারম্যান ইফতেখার আলম বাবলু বলেন, 'আমি প্রকল্পের বিষয়ে কিছুই জানি না। আমার সঙ্গে সমন্বয় করা হয় না। আমি নামমাত্র চেয়ারম্যান পদে আছি।'
নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের কাঠমা ফয়েজভানী দাখিল মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রের রাস্তা পুননির্মাণে ৯ টন ৬৬০ কেজি চাল বরাদ্দ আসে। স্থানীয় বাসিন্দা আলমাছ এবং মাসুম মিয়া বলেন, 'প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। কেউ কাজ করতেও আসছে না।'
প্রকল্পটির সভাপতি ও নোয়ারপাড়া ইউপির সদস্য রকিবুল হাসান বলেন, 'সাত মাস আগে কাজ শেষ করেছি। ইউএনও স্যারের দিকনির্দেশনায় কাজ করা হয়েছে।'
পলবান্ধা ইউনিয়নের পূর্ব সিরাজাবাদ নদরুর বাড়ি সংলগ্ন ব্রিজের পার্শ্বে গাইড ওয়াল নির্মাণে ৪ টন ২১০ কেজি গম বরাদ্দ আসে। এলাকাবাসীর আকবর, আক্রাম এবং পারভীন বলেন, '১৫-২০ হাজার টাকা ব্যয়ে কাজ করে বরাদ্দের বাকি চাল আত্মসাত করা হয়েছে।'
পলবান্ধা ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান কমল বলেন, 'বরাদ্দ যেমন, কাজ তেমন। চাল লুটপাটের অভিযোগ ভিত্তিহীন।'
ইউএনও শাহ্ মো. জুবায়ের বলেন, 'এ উপজেলায় আমার যোগদানের আগেই প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ ছাড় দেওয়া হয়েছে। যাঁরা তদারকিতে ছিলেন, বিষয়টি তাঁদেরই খতিয়ে দেখার দায়িত্ব।'
তৎকালীন ইউএনও নামজুল হুসাইন বলেন, 'প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হয়ে থাকলে; বিল না দিতে পিআইওকে নির্দেশনা দিয়েছি। অনিয়ম-দুর্নীতি হয়ে থাকলে; এক্ষেত্রে পিআইও দায় এড়াতে পারে।'
ইসলামপুরে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বকশীগঞ্জের পিআইও মো. হাবীবুর রহমান সুমন বলেন, 'প্রকল্প পরিদর্শন করে বিল দিয়েছি। যথাযথভাবে কাজ না করে থাকলে; কাজ করানো হবে।'
গত ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এখন কীভাবে কাজ করানো হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'কাজ শেষ হয়েছে মর্মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়নি। মাঠ পর্যায়ে কাজ চলমান।'
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন মো. আব্দুল্লাহেল কাফি বলেন, 'প্রকল্পের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়ে থাকলে; তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
৪ ঘন্টা ৩৬ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ১৩ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ২১ মিনিট আগে
১০ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে
১০ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে