জামালপুরের মেলান্দহ থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই জামিন অযোগ্য দণ্ড ধারায় মামলা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্তরা হলেন, মামলা রুজুকারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এটিএম মাহমুদুল হক এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) শ্রী গোপাল চন্দ্র ঘোষ।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মামলার এজাহারে মারধরের ঘটনায় গুরুতর কাটা-জখমের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো ঘটনাই ঘটেনি। বরং উদ্দেশ্য হাসিল করতে হয়রানিমূলক মামলা রুজু করেছে পুলিশ।
মেলান্দহ থানা সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (৬ আগষ্ট) বাদী হয়ে ওই মামলাটি করেন মেলান্দহ উপজেলার মুন্সী নাংলা গ্রামের আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী মোছা. কল্পনা (৩০)। এতে প্রতিবরশী মো. আসাদ মিয়া (৪২) ও তাঁর স্ত্রী সাহারা বেগমকে (৩৭) আসামি করা হয়েছে।
তদন্ত ছাড়াই জামিন অযোগ্য ধারার মামলা রুজু করায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। তবে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতেই মামলাটি রুজু করা হয়েছে। তদন্তে শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ জখমীর চিকিৎসা সনদ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা আর বাদী পাশাপাশি বাড়িতে বসবাস করেন। ২০২৪ সালের ১৮ আগষ্ট ১ নম্বর আসামি আসাদ মিয়ার
কাছ থেকে ২০ শতাংশ জমি এক লাখ ৩০ হাজার টাকায় বন্ধক নেন মামলার বাদী কল্পনা। আসাদ মিয়ার কাছ থেকে জমি দখলে নিয়ে চাষাবাদ করে আসছেন কল্পনা। ইতোমধ্যে স্থানীয় মসজিদ পরিচালক কমিটি নিয়ে আসাদ মিয়ার সঙ্গে কল্পনার শ্বশুর মামলার ২ নম্বর সাক্ষী আব্দুল আওয়াল চাঁনের শত্রুতা চলে আসছে। এনিয়ে কল্পনাকে দেওয়া বন্ধকী জমি চাষাবাদ করতে না দিয়ে বন্ধকীর টাকা আত্মসাতের ষড়যন্ত্র করছে আসাদ মিয়া। মমতাবোধ গত সোমবার (৩ আগষ্ট) দুপুর ১টার দিকে কল্পনার ভাসুর মামলার ১ নম্বর সাক্ষী আমিনুল ইসলাম বন্ধকী জমিতে চাষাবাদ করতে গেলে বাঁধা দেয় আসাদ মিয়া এবং তাঁর স্ত্রী সাহারা বেগম। এসময় ঘটনাস্থলে গিয়ে জমি বন্ধকী নেওয়ার টাকা ফেরত চাওয়ায় আসাদ মিয়ার হাতে থাকা কাচি দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে গলায় ফেস মারলে কল্পনা তা ফিরানোর ফলে তাঁর বাম হাতের কবজির উপরে অংশ মারাত্মক গুরুতর রক্তাক্ত কাটা-জখম হয়। এরপর আসাম মিয়া তলপেটে লাথি মেরে কল্পনাকে মাটিতে ফেলে গলায় কাচি দিয়ে ফেস দেওয়ায় মারাত্মক গুরুতর রক্তাক্ত কাটা-জখম করে। আসাদ মিয়ার স্ত্রী সারাহা বেগম লোহার রড দিয়ে কল্পনার পিঠে, কোমরে, উভয় পায়ে ও হাতে বাইরিয়ে মারাত্মক লীলা ফুল জখম করে। এসময় কল্পনাকে রক্ষা করতে তাঁর দেবর মামলার ১ নম্বর সাক্ষী আমিনুর এগিয়ে এলে আসামিরা তাঁকেও আক্রমণ করে। পরে তাঁর ডাক-চিৎকারে আশেপাশের লোকজন কল্পনাকে উদ্ধার করে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কল্পনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় স্বাক্ষী আমিনুরকে দিয়ে এজাহার থানায় পাঠানো হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মারধরের আহতদের
রেজিস্ট্রারের নথিতে কল্পনার শরীরে গুরুতর কোনো আঘাতের তথ্য নেই। এছাড়া সার্জারি বিভাগেও তাঁর ভর্তির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, গত ২১ জুলাই কল্পনা এবং আসামিদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছিলো। কিন্তু মামলার এজাহারে উল্লিখিত ঘটনার বিষয়ে আশেপাশের লোকজন কিছুই জানেন না। কল্পনার বাড়িতে গেলে তাঁর শরীরে মারধরের আঘাতের কোনো চিহ্নও তিনি দেখাতে পারেননি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মিথ্যে ঘটনায় মামলা করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ফজলু মিয়া, আকবর এবং মিজান বলেন, কল্পনাকে মারধর করা হয়নি। কিন্ত ঘটনা না ঘটলেও পুলিশ কীভাবে মামলাটি নিলো, তা আমরা জানি না।
মামলার প্রধান আসামি আসাদ মিয়া বলেন, শত্রুতার জের ধরে গত ২১ জুলাই দুপুরে কল্পনা এবং তাঁর শ্বশুর আব্দুল আওয়ালসহ অনেকেই আমার বাড়িতে ঢুকে আমাদের মারধর, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যান। এ ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে। ঘটনার সত্যতা থাকায় আমি ২৩ জুলাই থানায় মামলা করেছি। এই মামলার আসামিরা আদালত থেকে জামিনে এসে আমাদের হয়রানি করতে মিথ্যে মামলা করেছে।
যেখানে কোনো ঘটনায় ঘটেনি, সেখানে জামিন অযোগ্য দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারায় পুলিশ মামলাটি নিয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ওই মিথ্যা মামলা থেকে আমাদের মুক্তি দেওয়া হক ।’
আসামি সাহারা বেগম বলেন, শরীরে কোনো আঘাত না থাকার পরও পুলিশ কীভাবে মামলা নিলো, তা নিয়ে আমরা চিন্তিত। আইনজীবীরা পরামর্শ দিয়েছেন, চার্জশিটের আগে এই মামলায় জামিন পাওয়ার সুযোগ নেই।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক বলেন, কল্পনা নামে এক নারী প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁর শরীরে গুরুতর কাটা-জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
মামলার বাদী মোছা. কল্পনা বলেন, আমি সত্য ঘটনায় মামলা করেছি।'
আপনি হাসপাতালে কয়দিন ছিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্নে ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, এতো প্রশ্ন করেন কেন? আপনার টাকা খেয়ে এসেছেন। আপনাদের বিচার আল্লাহই করবো। আমি ব্যস্ত। আর কথা বলতে পারব না।
মেলান্দহ থানার ওসি এটিএম মাহমুদুল হক বলেন, ওই নারী হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার কাগজ দেখিয়ে ছিলো। এ ছাড়া তদন্ত কর্মকর্তার প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতেই মামলা রুজু করা হয়েছে। অর্থাৎ জখমীর চিকিৎসা সনদ অনুযায়ী প্রতিবেদন দেওয়া হবে। ঘটনাটি মিথ্যা হলে বাদীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মেলান্দহ থানার এসআই শ্রী গোপাল চন্দ্র ঘোষের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে, তিনি বলেন প্রাথমিক তদন্ত করেই মামলাটি নেওয়া হয়েছে।
এলাকাবাসী এবং আসামিপক্ষের দাবি, এজাহারে উল্লেখিত ঘটনা ঘটেনি; তবে আপনি প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পেলেন কীভাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মোবাইল ফোনে মামলার বিষয়ে তেমন কিছু বলা যায় না। থানায় আসলে বিস্তারিত আলাপ হবে বলেই কল কেটে দেন তিনি।
জামালপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মোছা. ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। কেউ যাতে মিথ্যে অভিযোগে দায়ের করা মামলায় হয়রানির শিকার না হন, সেটা দেখার নিশ্চয় আমাদের দায়িত্ব।
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী মুহাম্মদ মানিক মিয়া বলেন, দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারাটি নিম্ন আদালতে জামিন অযোগ্য। এই ধারার অপরাধের গ্রাউন্ড থাকলে স্বেচ্ছায় আদালতে হাজির হয়ে জামিনের প্রার্থনা করলেও জামিন না হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী। এরকম গুরুত্বপূর্ণ ধারায় মামলা এফআইআর করার আগে অবশ্যই পুলিশকে প্রাথমিক তদন্ত করাটা জরুরি। এক্ষেত্রে একজন নারী পুলিশ সদস্যকে দিয়ে আঘাতের স্থানগুলো পরীক্ষা করা দরকার ছিলো। কেউ মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হলে, এক্ষেত্রে পুলিশ দায়ভার এড়াতে পারে না।
১ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৪২ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে