শৈশব মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে শিশুরা যা দেখে, যা শেখে এবং যে মূল্যবোধ অর্জন করে, তার প্রভাব তাদের সমগ্র জীবনজুড়ে থেকে যায়। “শিক্ষা আলো, শিক্ষাই শক্তি”—এই চিরন্তন সত্যকে ধারণ করেই একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের ভিত্তি নির্মিত হয়। আর সেই ভিত্তির প্রথম স্তম্ভ হলো মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের মাধ্যমে যে ঐতিহাসিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ আজ প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে কেবল শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-4) অর্জনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সকল শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়ার হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা। নড়িয়া উপজেলার প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমি প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করি, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন শুধু একটি সরকারি দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের প্রতিটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার এক পবিত্র সামাজিক অঙ্গীকার।
পরিসংখ্যানের আলো-আঁধারি: সাফল্য ও নতুন উদ্বেগ:
প্রাথমিক শিক্ষায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং উপবৃত্তি কার্যক্রম গ্রামীণ জনপদে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এর একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৩-১৪ সালের দিকে দেশের ৭ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষের সাক্ষরতার হার যেখানে প্রায় ৫৮-৬০ শতাংশের মধ্যে ছিল, তা ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী ৭৪.৬৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৭.৯ শতাংশ। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের একটি বড় জাতীয় অর্জন।
তবে এই আলোকিত চিত্রের পাশাপাশি কিছু উদ্বেগজনক বাস্তবতাও রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার ধারাবাহিকভাবে কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে এ সূচকে কিছুটা নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের Annual Primary School Statistics (APSS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ঝরে পড়ার হার ১৩.১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬.২৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যও লক্ষণীয়। বর্তমানে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার ১৯.০২ শতাংশ, যেখানে মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ১৩.৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে বহু ছেলে শিশু শিক্ষাজীবন অসমাপ্ত রেখেই শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছে। নড়িয়ার মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে এই পরিসংখ্যানের বাস্তব প্রতিফলন আমি প্রায়ই প্রত্যক্ষ করি।
নড়িয়ার ভৌগোলিক বাস্তবতা, প্রবাস সংস্কৃতি ও মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ:
নড়িয়া উপজেলার শিক্ষাব্যবস্থায় কাজ করতে গিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কিছু বিশেষ ও জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। এর পেছনে নড়িয়ার ভৌগোলিক অবস্থান এবং এখানকার সামাজিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সুরেশ্বর, কেদারপুর, মোক্তারের চর ও ঘড়িসার সংলগ্ন পদ্মা নদী তীরবর্তী এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের শিকার। যদিও বর্তমান সরকারের বিভিন্ন স্থায়ী বাঁধ প্রকল্পের ফলে ভাঙন অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তবুও অতীতে বাস্তুচ্যুত হওয়া বহু পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনো পুরোপুরি পুনর্গঠিত হয়নি। পদ্মার বুকে জেগে ওঠা দুর্গম চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে বর্ষা মৌসুমে যাতায়াত অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। জোয়ারের পানি কিংবা আকস্মিক বন্যার সময় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
এ অঞ্চলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক বৈশিষ্ট্য হলো ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যমুখী অভিবাসন প্রবণতা। এই প্রবণতার কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব শিক্ষাক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে বাবা বিদেশে অবস্থান করায় এবং মা এককভাবে সংসার পরিচালনা করায় শিশুদের পড়াশোনার ওপর পর্যাপ্ত পারিবারিক তদারকি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। আবার কখনো কখনো বিদেশমুখী হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বকে আড়াল করে দেয়, ফলে শিশুদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও মনোযোগ কমে যেতে দেখা যায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় মৌসুমি শিশুশ্রমের বাস্তবতা। চরাঞ্চল ও অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারগুলোর অনেক শিশু কৃষিকাজ, মাছ ধরা কিংবা মৌসুমি উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হয়। বিশেষ করে পেঁয়াজ, রসুন ও সবজি চাষের মৌসুমে অনেক শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতে পারে না। সাময়িক এই অনুপস্থিতি অনেক সময় স্থায়ী ঝরে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ ছাড়া এখনো উপজেলার কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয় ডাবল-শিফটে পরিচালিত হচ্ছে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ সময় থেকে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে কোভিড-১৯ মহামারির পর সৃষ্ট শিখন ঘাটতি (Learning Loss) অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে পড়াশোনার প্রতি এক ধরনের নীরব অনীহা ও ভীতি তৈরি করেছে।
শিশুদের নেতৃত্ব বিকাশ ও দেয়ালিকা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা:
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক বিদ্যালয় শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের স্থান নয়; এটি ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির প্রথম পাঠশালা।
এই ভাবনা থেকেই নড়িয়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলার ২৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের অংশগ্রহণে বিশেষ দেয়ালিকা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি থেকে বের করে এনে নিজেদের সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়া।
দেয়ালিকা তৈরির প্রতিটি ধাপে শিক্ষার্থীরা দলগতভাবে কাজ করেছে। কেউ গল্প লিখেছে, কেউ কবিতা, কেউবা ছবি এঁকে দেয়ালিকাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পুরো কার্যক্রমে তারা সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সম্মানের চর্চা করেছে।
এই কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল শিশুদের আত্মবিশ্বাসের বিকাশ। নিজের হাতে তৈরি একটি দেয়ালিকা বিদ্যালয়ের দেয়ালে স্থান পেতে দেখে একজন শিশুর মধ্যে যে আত্মমর্যাদা ও গর্ববোধ সৃষ্টি হয়, তা তার ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা শিখেছে কীভাবে মতামত প্রকাশ করতে হয়, কীভাবে দলগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং কীভাবে সীমিত সম্পদের মধ্যেও সৃজনশীল কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে নেতৃত্বের প্রথম পাঠ এখান থেকেই শুরু হয়।
আমার বিশ্বাস, প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত এ ধরনের সৃজনশীল ও নেতৃত্ব-বিকাশমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশ আরও ত্বরান্বিত হবে।
উপসংহার:
প্রাথমিক শিক্ষা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে প্রয়োজন দক্ষ, মানবিক, সৃজনশীল ও নৈতিক নাগরিক; আর সেই নাগরিক তৈরির ভিত্তি নির্মিত হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই।
নদীভাঙন, ভৌগোলিক প্রতিকূলতা কিংবা প্রবাস-প্রবণতার মতো স্থানীয় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা যদি ঝরে পড়ার হার কমাতে এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে একটি সমৃদ্ধ নড়িয়া তথা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি নড়িয়া গড়ে তুলি, যেখানে কোনো শিশু দারিদ্র্য, ভৌগোলিক প্রতিকূলতা কিংবা সামাজিক বাস্তবতার কারণে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে না। কারণ আজকের প্রতিটি শিক্ষিত শিশুই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর।
লেখক: মোঃ আব্দুল কাইয়ুম খান
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নড়িয়া, শরীয়তপুর
৩ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে
১৬ দিন ১৩ ঘন্টা ৮ মিনিট আগে
২১ দিন ২২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট আগে
২৪ দিন ১ ঘন্টা ১৮ মিনিট আগে
২৫ দিন ২২ ঘন্টা ৫৪ মিনিট আগে
৩৪ দিন ৫ ঘন্টা ৪৯ মিনিট আগে
৩৬ দিন ২২ ঘন্টা ৩০ মিনিট আগে
৩৯ দিন ৭ মিনিট আগে