শারদীয় দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সমাজের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু এর আবেদন কেবল মন্দির, মণ্ডপ কিংবা ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মহালয়ার তর্পণ থেকে বিজয়া দশমীর বিসর্জন—পুরো আয়োজনের ভেতর দিয়ে বয়ে যায় স্মৃতি, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয়, সম্প্রীতি এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভের প্রত্যয়ের বার্তা। তাই দুর্গোৎসব একই সঙ্গে ধর্মীয় আচার ও সামাজিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
মহালয়া দিয়ে শুরু হয় দেবীপক্ষ। পিতৃপক্ষের অবসানে এই দিনটি পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের। তর্পণের মাধ্যমে মানুষ শুধু প্রয়াত স্বজনদের কথা মনে করে না; নিজের অস্তিত্বের শিকড়ের সঙ্গেও নতুন করে যুক্ত হয়। এ যেন স্মরণ করিয়ে দেওয়া—বর্তমান কখনো অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। যে মানুষ তার পূর্বপুরুষকে স্মরণ করতে জানে, সে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে পারে।
দুর্গাপূজার পৌরাণিক আখ্যানেও রয়েছে গভীর প্রতীকী শিক্ষা। রামচন্দ্রের অকালবোধন থেকে মহিষাসুরবধ—সব কাহিনির কেন্দ্রে অশুভের বিরুদ্ধে শুভের সংগ্রাম। রামের পদ্ম নিবেদনের কাহিনি আত্মনিবেদনের প্রতীক; মহিষাসুরবধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় ও সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। পৌরাণিক কাহিনিকে ইতিহাস হিসেবে নয়, মানুষের নৈতিক বোধের প্রতীক হিসেবে দেখলে এর আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা আরও স্পষ্ট হয়।
আজকের মহিষাসুর তাই কোনো এক পৌরাণিক চরিত্রে আটকে নেই। সমাজের হিংসা, লোভ, দুর্নীতি, বৈষম্য, অসহিষ্ণুতা, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা কিংবা প্রকৃতি ধ্বংসের প্রবণতাও অশুভেরই নানা রূপ। দেবীর হাতে অসুরবধের প্রতীকী তাৎপর্য তখন হয়ে ওঠে একটি প্রশ্ন—আমরা কি নিজেদের সমাজের অশুভ শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছি?
শ্রীশ্রীচণ্ডীর রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধির কাহিনিও এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা আপনজন ও সম্পদ হারিয়েও তাঁদের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। মেধা ঋষির ব্যাখ্যায় তাঁরা বুঝতে পারেন মানুষের সঙ্গে মায়া ও মমতার সম্পর্ক কত গভীর। এই কাহিনি ধর্মীয় ব্যাখ্যার পাশাপাশি মানুষের মনস্তত্ত্বেরও এক অনন্য পাঠ। মানুষ শুধু যুক্তিতে বাঁচে না; সম্পর্ক, স্মৃতি ও মমতাও তার জীবনকে পরিচালিত করে।
দুর্গাপূজার সামাজিক শক্তি এখানেই। একটি পূজা যখন সর্বজনীন হয়, তখন তা শুধু একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান থাকে না; হয়ে ওঠে এলাকার মানুষের মিলনক্ষেত্র। ঢাকের শব্দ, অঞ্জলি, ধুনুচি নাচ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা কিংবা বিজয়ার শুভেচ্ছা—সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় সামাজিকতার এক উন্মুক্ত পরিসর।
বাংলাদেশের মতো বহুধর্মীয় সমাজে এই দিকটির গুরুত্ব বিশেষ। একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে পালিত হওয়া শুধু সেই সম্প্রদায়ের অধিকার নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সহনশীলতারও পরীক্ষা। অন্যের উৎসবকে সম্মান করা মানে নিজের বিশ্বাস ত্যাগ করা নয়; বরং ভিন্নতার মধ্যেও সহাবস্থানের সংস্কৃতি তৈরি করা।
তবে উৎসবের আড়ম্বর যত বাড়ছে, ততই প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি উৎসবের মূল শিক্ষা ধরে রাখতে পারছি? মণ্ডপের উচ্চতা, আলোকসজ্জার চাকচিক্য, থিমের অভিনবত্ব কিংবা ব্যয়ের প্রতিযোগিতা উৎসবকে আকর্ষণীয় করতে পারে; কিন্তু মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করতে পারে না। দুর্গোৎসবের সার্থকতা তাই শুধু আয়োজনের আকারে নয়, মানুষের আচরণে।
প্রতিমাশিল্পীদের সৃজনশীলতা, মণ্ডপসজ্জার নতুনত্ব, লোকজ সংস্কৃতির পুনরাবিষ্কার এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দুর্গোৎসবকে নান্দনিকভাবে সমৃদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে পোশাক, খাবার, মেলা ও কেনাকাটাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারিগর, শিল্পী ও শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার সঙ্গে এই উৎসবের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে দুর্গাপূজা এখন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।
তবু সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ অর্থ নয়—সম্পর্ক। শৈশবের নতুন পোশাক, অঞ্জলির ফুল, ঢাকের শব্দ, মেলার মাটির খেলনা, আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া কিংবা বিজয়ার প্রণাম—এসব স্মৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উৎসবের মানবিক উত্তরাধিকার বহন করে। প্রযুক্তি বদলেছে, আয়োজন বদলেছে, কিন্তু মানুষের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি।
এই জায়গাতেই দুর্গোৎসবের সবচেয়ে বড় শক্তি। দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক হলেও সেই শক্তির উদ্দেশ্য নিছক ধ্বংস নয়; অশুভকে সরিয়ে শুভের প্রতিষ্ঠা। তাই দুর্গাপূজার প্রকৃত শিক্ষা যদি জীবনে ধারণ করতে হয়, তবে আমাদের লড়াই করতে হবে ঘৃণার বিরুদ্ধে ভালোবাসা দিয়ে, অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সহনশীলতা দিয়ে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় দিয়ে।
মহালয়ায় আমরা পূর্বপুরুষদের স্মরণ করি; কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া সমাজটিকে কেমন করে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেব, সেটিও ভাবতে হবে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন হয়; কিন্তু দেবীর সঙ্গে কি আমাদের শুভবোধও বিসর্জনে যায়? যদি তা না যায়, তবেই পূজা অর্থবহ।
আজ তাই প্রয়োজন এমন দুর্গোৎসব, যেখানে ধর্মীয় আচার থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে মানবিক দায়িত্ব; আনন্দ থাকবে, কিন্তু থাকবে সংযম; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু থাকবে সৌহার্দ্য; উৎসব থাকবে, কিন্তু কেউ যেন নিরাপত্তাহীন বা বঞ্চিত বোধ না করে।
দুর্গাপূজা শেষ পর্যন্ত একটি প্রার্থনার নাম। সেই প্রার্থনা শুধু নিজের জন্য নয়—সকলের জন্য। মানুষের শান্তি, সমাজের সম্প্রীতি, প্রকৃতির সুরক্ষা এবং দেশের কল্যাণের জন্য।
শুভের শক্তি যেন অশুভকে পরাভূত করে—এ শুধু পুরাণের গল্প নয়, প্রতিদিনের জীবনেরও দাবি। তাই এবারের দুর্গোৎসবে দেবীর কাছে আমাদের প্রার্থনা হোক—মানুষের ভেতরের অন্ধকার দূর হোক, সমাজে আস্থার আলো জ্বলুক, ভিন্নতার মধ্যে সম্প্রীতি দৃঢ় হোক।
১৩ ঘন্টা ২৯ মিনিট আগে
১২ দিন ৮ ঘন্টা ৬ মিনিট আগে
১২ দিন ১০ ঘন্টা ৪০ মিনিট আগে
১৩ দিন ৫ ঘন্টা ৩০ মিনিট আগে
১৭ দিন ২০ ঘন্টা ২২ মিনিট আগে
২২ দিন ৬ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে
২৪ দিন ১৬ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে
৩২ দিন ৭ ঘন্টা ৩৯ মিনিট আগে