শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিন মহাসপ্তমী। ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার যে আনুষ্ঠানিক আরাধনা শুরু হয়, সপ্তমীতে তা পূর্ণতা পেতে থাকে নবপত্রিকা প্রবেশ, কলাবউয়ের স্নান, দেবীর মহাস্নান ও সপ্তমীবিহিত পূজার মধ্য দিয়ে। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি ও মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। ভক্তরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন শান্তি, শক্তি, মঙ্গল ও কল্যাণের। কিন্তু মহাসপ্তমীর তাৎপর্য কেবল পূজার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর অন্তর্নিহিত বার্তা শক্তির জাগরণ, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, অশুভের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং মানুষের মধ্যে শুভবোধ প্রতিষ্ঠা।বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা হয়েছে। আজ ১৭ অক্টোবর শনিবার মহাসপ্তমী। ষষ্ঠীতে দেবীর বোধনের পর সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা স্নান ও স্থাপনের মধ্য দিয়ে পূজার গুরুত্বপূর্ণ পর্ব শুরু হয়। পুরোহিতেরা শাস্ত্রবিধি অনুসারে সপ্তমীবিহিত পূজা সম্পন্ন করেন। ভক্তরা অঞ্জলি দেন, দেবীর সামনে প্রার্থনায় মিলিত হন। প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানের পেছনে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, পৌরাণিক ব্যাখ্যা ও বাঙালির দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।মহাসপ্তমীর বিশেষ আকর্ষণ নবপত্রিকা, যা সাধারণ মানুষের কাছে কলাবউ নামে পরিচিত। কলাগাছের সঙ্গে কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ একত্রে বেঁধে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়। পরে তা স্নান করিয়ে নতুন শাড়ি পরিয়ে পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়। প্রচলিত রীতিতে গণেশের পাশে নবপত্রিকা রাখা হয়।নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদকে দেবীর নয়টি শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ব্রহ্মাণী, কালিকা, উমা, কার্তিকী, শিবা, রক্তদন্তিকা, শোকরহিতা, চামুণ্ডা ও লক্ষ্মীর সঙ্গে এসব উদ্ভিদের প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়। অঞ্চল ও পূজাপদ্ধতিভেদে এই ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্যও দেখা যায়।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। দুর্গাপূজার কেন্দ্রে দেবীর প্রতিমা থাকলেও মহাসপ্তমীতে উদ্ভিদকে দেবীর প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। অর্থাৎ প্রকৃতির উপাদানও পূজার অংশ হয়ে ওঠে। কলা, ধান, হলুদ, কচু ও বেলের মতো উদ্ভিদ মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত। এসব উদ্ভিদের উপস্থিতি মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবন প্রকৃতির দানের ওপর নির্ভরশীল।এই দৃষ্টিতে নবপত্রিকার আরাধনাকে প্রকৃতির প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। তবে ধর্মীয় আচার পালন করলেই প্রকৃতি রক্ষা হয় না। সেই বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে গাছপালা সংরক্ষণ, জলাশয় দূষণমুক্ত রাখা, কৃষিজমি রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার দায়িত্বও পালন করতে হবে। প্রকৃতিকে দেবীর প্রতীক হিসেবে পূজা করে বাস্তবে প্রকৃতির ক্ষতি করা হলে পূজার অন্তর্নিহিত শিক্ষার সঙ্গে আমাদের কাজের অসংগতি থেকেই যায়।মহাসপ্তমীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আচার দেবীর মহাস্নান। প্রচলিত পূজাপদ্ধতিতে প্রতিমার সামনে দর্পণ রেখে তাতে প্রতিফলিত দেবীমূর্তিকে বিভিন্ন উপাচারে স্নান করানো হয়। শুদ্ধজল, গঙ্গাজল, দুধ, মধু, সুগন্ধি জল ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহারের বিধান রয়েছে। পূজাপদ্ধতিভেদে উপাচারের ধরনেও পার্থক্য দেখা যায়।ধর্মীয় দৃষ্টিতে মহাস্নান পবিত্রতা ও শুদ্ধতার প্রতীক। এর তাৎপর্যকে মানবজীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে আত্মশুদ্ধি, সংযম ও বিবেক জাগ্রত করার শিক্ষা পাওয়া যায়। মানুষের বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি চিন্তা ও আচরণেও শুদ্ধতা প্রয়োজন। অন্যের অধিকার হরণ, দুর্বলকে অবহেলা, দুর্নীতি, হিংসা কিংবা বৈষম্য বজায় রেখে শুধু ধর্মীয় আচার পালন করলেই নৈতিকতার পূর্ণতা আসে না।দুর্গাপূজার প্রকৃত শিক্ষা তাই ব্যক্তিজীবনেও প্রযোজ্য। নিজের ভুল স্বীকার করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, অসহায় মানুষের পাশে থাকা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধের সামাজিক প্রকাশ ঘটে।দুর্গাপূজার পৌরাণিক কাহিনিতে মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার যুদ্ধ শুভশক্তির সঙ্গে অশুভশক্তির সংঘাতের প্রতীক। দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে দেবীর আবির্ভাব এবং মহিষাসুর বধের কাহিনি মানুষের কাছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের বার্তা বহন করে।মহিষাসুরকে কেবল পৌরাণিক এক অসুর হিসেবে দেখলে এই কাহিনির নৈতিক তাৎপর্যের একটি দিকই সামনে আসে। এর প্রতীকী পাঠে অহংকার, লোভ, অত্যাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারকেও অশুভ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এসব প্রবণতা ব্যক্তি ও সমাজের শান্তি নষ্ট করে। অন্যদিকে ন্যায়বোধ, সাহস, সংযম ও সম্মিলিত উদ্যোগ মানুষের কল্যাণের পথ তৈরি করে।দেবী দুর্গার দশ হাত ও দশ অস্ত্র শক্তি, সামর্থ্য ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। দেবীর হাতে অস্ত্র থাকার অর্থ অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ না করা। তবে এই শিক্ষা প্রতিহিংসা বা বিদ্বেষের নয়; বরং অন্যায় প্রতিরোধ করে ন্যায় প্রতিষ্ঠার। সমাজে যখন দুর্বল মানুষ নির্যাতনের শিকার হন, নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ বৈষম্যের শিকার হন, তখন ন্যায় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যায় না।দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের উপস্থিতিও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রচলিত প্রতীকী ব্যাখ্যায় লক্ষ্মী সমৃদ্ধি, সরস্বতী জ্ঞান ও বিদ্যা, গণেশ বুদ্ধি ও শুভসূচনা এবং কার্তিক বীরত্ব ও শৌর্যের প্রতীক। সিংহ দেবীর শক্তি ও সাহসের পরিচায়ক, আর মহিষাসুর অশুভ শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে।এই প্রতীকগুলোকে একসঙ্গে দেখলে মানুষের জীবনের কয়েকটি মৌলিক প্রয়োজন সামনে আসে। জ্ঞান ছাড়া সমৃদ্ধি দায়িত্বশীল হয় না, সাহস ছাড়া ন্যায় প্রতিষ্ঠা কঠিন, আর বুদ্ধি ছাড়া শক্তির সঠিক ব্যবহার সম্ভব নয়। তাই দুর্গাপূজার প্রতীকী জগৎ কেবল দেবদেবীর উপাসনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; জীবনের নানা গুণ ও মূল্যবোধের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।দেবী দুর্গার আগমনকে বাঙালি কন্যার পিতৃগৃহে ফিরে আসার আবেগের সঙ্গেও যুক্ত করে দেখে। এই পারিবারিক অনুভূতি দুর্গোৎসবকে মানুষের কাছে আরও আপন করে তোলে। মায়ের আগমন, সন্তানদের উপস্থিতি এবং কয়েক দিনের উৎসব শেষে বিদায়ের বেদনা বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। ধর্মীয় আচার ও পারিবারিক আবেগের এই সংযোগই দুর্গোৎসবকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে।দুর্গাপূজা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসবকে ঘিরে পূজামণ্ডপে মানুষের সমাগম হয়, স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসে এবং বিভিন্ন পেশার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়। প্রতিমাশিল্পী, কুমোর, মালাকার, ঢাকি, আলোকসজ্জাকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্বেচ্ছাসেবকদের শ্রমে উৎসবের আয়োজন সম্পন্ন হয়। ফলে দুর্গোৎসবের একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে।সাতক্ষীরার আশাশুনিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে। কিন্তু উৎসবের আনন্দ সবার জন্য নিরাপদ করতে হলে আয়োজনের পাশাপাশি দায়িত্বশীলতাও প্রয়োজন। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, নারী ও শিশুদের চলাচল, অগ্নিনিরাপত্তা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিমা বিসর্জনের সময় নদী ও জলাশয় দূষণ কমানোর উদ্যোগও জরুরি।বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সম্প্রীতি মানে শুধু উৎসবের সময় শুভেচ্ছা বিনিময় নয়। এর অর্থ প্রত্যেকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করা এবং বিপদে প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে বা উপাসনালয়ে হামলার শিকার হলে সেটিকে শুধু একটি সম্প্রদায়ের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসনের প্রশ্ন।প্রশাসনের দায়িত্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষকে গুজব, উসকানি ও বিদ্বেষমূলক প্রচারের বিরুদ্ধে সচেতন থাকতে হবে। উৎসবের সৌন্দর্য তখনই বাস্তব হয়ে ওঠে, যখন মানুষ ভয় ছাড়া নিজের ধর্ম পালন করতে পারেন এবং অন্যের আনন্দে বাধা না দিয়ে পাশে দাঁড়াতে পারেন।সপ্তমী আমাদের সামনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে। প্রথমত, শক্তির প্রয়োজন অন্যায় ও অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। দ্বিতীয়ত, প্রকৃতি মানুষের জীবন ও জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ; তাই প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্বও মানুষের। তৃতীয়ত, ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল্য তখনই সামাজিকভাবে প্রকাশ পায়, যখন তা মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও দায়িত্বশীল আচরণে প্রতিফলিত হয়।দেবী দুর্গার আরাধনায় ভক্তরা শান্তি ও কল্যাণ কামনা করেন। সেই কামনাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করাই মহাসপ্তমীর গভীর তাৎপর্য। ঘরে ঘরে নিরাপত্তা, সমাজে ন্যায়বিচার, প্রকৃতির সুরক্ষা এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা ছাড়া কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পায় না।ঢাকের বাদ্য ও শঙ্খধ্বনিতে আজ পূজামণ্ডপ মুখরিত হোক। কিন্তু উৎসবের শব্দ থেমে যাওয়ার পরও যেন তার শিক্ষা থেকে যায় মানুষের আচরণে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস, প্রকৃতির প্রতি যত্ন এবং ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষের মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকারই হোক মহাসপ্তমীর প্রকৃত প্রার্থনা।
৫ ঘন্টা ৩৯ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ৪২ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ৪ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ৫৬ মিনিট আগে
৯ ঘন্টা ২৫ মিনিট আগে