বৃহত্তর লাকসামে ১২০ সাংবাদিকের অংশগ্রহণে প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত লাখাইয়ে পুকুরের মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে দু-পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ৪০। আশাশুনিতে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে এসপি দোহাজারীকে উপজেলা ঘোষণার দাবিতে মানববন্ধন শেষে সড়ক অবরোধ পীরগাছায় বসতবাড়ির প্রবেশপথ খুঁড়ে ফেলা, বাড়ির আঙিনা ও ঘরের দেয়াল ঘেঁষে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে চলাচলে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ জাতিকে নেতৃত্ব দিতে যোগ্য ছাত্র তৈরিতে অভিভাবকের ভূমিকা অপরিসীম,বরকত উল্লাহ বুলু লাখাইয়ে পুলিশ অভিযানে ৩কেজি গাঁজা সহ নারী মাদক কারবারী গ্রেপ্তার। শ্যামনগরে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে তথ্য সংগ্রহকারীদের প্রশিক্ষণ উদ্বোধন দিল্লিতে আটক পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা মহালয়ার অমাবস্যা: পিতৃস্মরণ থেকে দেবীবন্দনা মিরসরাই প্রেস ক্লাবের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা, সভাপতি আবু সাঈদ ভূঁইয়া, সম্পাদক এম মাঈন উদ্দিন নড়িয়ায় ‘আলোকিত ডিংগামানিক ফাউন্ডেশন’-এর যাত্রা শুরু, সভাপতি মনির হোসেন ও সম্পাদক সোলায়মান খান রানা শ্রীমঙ্গলে বই পড়া উৎসবে ‘মুকুল’ থেকে ‘ফুল’ হয়ে ‘ফল’ রূপের বিস্ময়কর সফর, মোবাইল ও ডিজিটাল পর্দা ছেড়ে বইয়ের পাতায় ২৫ হাজার প্রাণ কুলিয়ারচরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান সুন্দরবনে আলিফ বাহিনীর ১৫ দস্যুর আত্মসমর্পণ জয়পুরহাটে সনাতন ধর্মের শ্রমিকদের মাঝে পূজার উপহার বিতরণ প্রবাসী মনসুরের নিথর দেহ ফিরল গ্রামে, স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হলো আকাশ-বাতাস লালপুরে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন আক্কেলপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে বৃদ্ধের মৃত্যু ইরান যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে দেশে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে: বিদ্যুৎমন্ত্রী

মহালয়ার অমাবস্যা: পিতৃস্মরণ থেকে দেবীবন্দনা

আকাশে শরতের সাদা মেঘ, বাতাসে শিউলির গন্ধ আর ভোরের স্তব্ধতা ভেঙে চণ্ডীপাঠের ধ্বনি—বাঙালি হিন্দুর মনে দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা নিয়ে আসে মহালয়া। তবে মহালয়া কেবল দেবী দুর্গার আবাহনের দিন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পিতৃস্মরণ, পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জীবন-মৃত্যুর সম্পর্ক উপলব্ধি করার এক গভীর ধর্মীয় ঐতিহ্য। মহালয়ার অমাবস্যা তাই একই সঙ্গে স্মৃতি, বিশ্বাস ও আত্মোপলব্ধির দিন।

হিন্দু চান্দ্র পঞ্জিকা অনুসারে, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের শেষ তিথি অমাবস্যা। এই তিথিতেই পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে এবং পরদিন থেকে দেবীপক্ষের সূচনা হয়—যদিও পঞ্জিকাভেদে তিথি ও সূচনার সময়ের তারতম্য থাকতে পারে। প্রচলিত বিশ্বাসে, এই দিনে প্রয়াত পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করা হয়। নদী, পুকুর কিংবা জলাশয়ের তীরে দাঁড়িয়ে জল নিবেদন করে তাঁদের স্মরণ করেন অনেকে। এই আচার শুধু পরলোকগত আত্মার শান্তি কামনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের শিকড়, পারিবারিক ইতিহাস ও পূর্ববর্তী প্রজন্মের অবদানও স্মরণ করে।

প্রশ্ন হলো, মহালয়ার অমাবস্যার তাৎপর্য কি শুধু ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ? সময়ের দাবি বলছে, এর মানবিক অর্থও আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।

পিতৃস্মরণ কেন জরুরি

মানুষ একা নিজের জীবন গড়ে তোলে না। তার অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং পূর্ববর্তী বহু প্রজন্মের শ্রম, ত্যাগ ও অভিজ্ঞতা। তাঁদের কাছ থেকেই আসে ভাষা, সংস্কার, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। পিতৃপুরুষের উদ্দেশে তর্পণের মধ্য দিয়ে সেই উত্তরাধিকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু বাস্তব জীবনে আমরা প্রায়ই দেখি, জীবিত বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা রয়েছে। বৃদ্ধ বয়সে অনেক মা-বাবা সন্তানের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হন। অথচ তাঁদের মৃত্যুর পর আনুষ্ঠানিক শ্রাদ্ধ বা তর্পণে কোনো কার্পণ্য থাকে না। এই বৈপরীত্য আমাদের ভাবায়। মৃতের উদ্দেশে ধর্মীয় আচার পালন যেমন বিশ্বাসের বিষয়, তেমনি জীবিত মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনও নৈতিক কর্তব্য।

পিতৃস্মরণের প্রকৃত শিক্ষা এখানেই—যাঁরা আমাদের জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা যেন শুধু নির্দিষ্ট তিথির আনুষ্ঠানিকতায় আটকে না থাকে।

অমাবস্যার অন্ধকার, দেবীপক্ষের আলো

অমাবস্যা মানেই চাঁদহীন রাত। প্রকৃতির এই অন্ধকারকে ঘিরে মানুষের মনে নানা ধর্মীয় অনুভূতি ও প্রতীকী অর্থ তৈরি হয়েছে। মহালয়ার অমাবস্যার পরই দেবীপক্ষের আগমন বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে নতুন প্রত্যাশা জাগায়। চণ্ডীপাঠে দেবীর আবাহন, মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের সুর এবং আগমনী গানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গোৎসবের প্রতীক্ষা।

দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস ও অশুভের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। পৌরাণিক কাহিনিতে মহিষাসুরের বিরুদ্ধে তাঁর বিজয় অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাকে নির্দেশ করে। এই প্রতীকী বার্তা আজও প্রাসঙ্গিক। সমাজে যখন অন্যায়, নারী নির্যাতন, বৈষম্য কিংবা দুর্বল মানুষের ওপর নিপীড়ন দেখা যায়, তখন দেবীবন্দনার পাশাপাশি সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহসও প্রয়োজন।

দুর্গাপূজার আনন্দ তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন দেবীর আরাধনা মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত হয়। মণ্ডপে দেবীর সামনে প্রার্থনা করে ঘরের নারী, শিশু কিংবা অসহায় মানুষের প্রতি অন্যায়কে উপেক্ষা করলে সেই আরাধনার মানবিক তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

লোকাচার ও বিশ্বাসের মর্যাদা

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে মহালয়াকে ঘিরে নানা রীতি ও পারিবারিক প্রথা প্রচলিত রয়েছে। কোথাও নদীতে তর্পণ করা হয়, কোথাও বাড়িতে ধর্মীয় আচার পালিত হয়, আবার কোথাও পূর্বপুরুষের স্মরণে দান-ধ্যানের আয়োজন থাকে। এসব প্রথার মধ্যে স্থানীয় সংস্কৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্যের ছাপ রয়েছে।

তবে সব অঞ্চলে একই নিয়ম প্রচলিত নয়। ধর্মীয় আচারের ব্যাখ্যাও সম্প্রদায়, পরিবার ও পঞ্জিকাগত রীতি অনুসারে ভিন্ন হতে পারে। তাই কোনো একটি প্রথাকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক বলে বিবেচনা করা ঠিক নয়। বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখেই তার অন্তর্নিহিত শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।

ধর্মীয় আচারের সঙ্গে কুসংস্কারের পার্থক্য করাও জরুরি। ভয় দেখিয়ে কাউকে কোনো আচার পালনে বাধ্য করা কিংবা নির্দিষ্ট নিয়ম না মানলে অমঙ্গল ঘটবে বলে আতঙ্ক ছড়ানো ধর্মীয় অনুভূতির সুস্থ প্রকাশ নয়। ধর্ম মানুষের মনে সংযম, কৃতজ্ঞতা ও সহমর্মিতা জাগাবে—এটাই প্রত্যাশিত।

উৎসবের আগে সমাজের দায়

মহালয়া দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা দেয়। এরপর মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ, সাজসজ্জা এবং পূজার প্রস্তুতি শুরু হয়। কিন্তু উৎসবের আয়োজনের পাশাপাশি আমাদের চারপাশের মানুষের কথাও ভাবতে হবে। অসচ্ছল পরিবার, প্রবীণ মানুষ, অসুস্থ ব্যক্তি কিংবা উৎসবের খরচ বহন করতে না পারা মানুষের পাশে দাঁড়ানোও সামাজিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশের মতো বহুধর্মীয় সমাজে দুর্গাপূজা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব হলেও এর সাংস্কৃতিক আনন্দ প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধবের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এই মিলন যেন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। কারও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে বিদ্রূপ, উপাসনালয়ে হামলা কিংবা উৎসব পালনে বাধা দেওয়ার কোনো স্থান সভ্য সমাজে থাকতে পারে না।

মহালয়ার অমাবস্যা আমাদের অতীতের দিকে তাকাতে শেখায়, আর দেবীপক্ষ সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়। একদিকে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, অন্যদিকে শক্তির আরাধনা—এই দুইয়ের মধ্যে রয়েছে জীবনের ধারাবাহিকতার শিক্ষা। অতীতকে অস্বীকার করে ভবিষ্যৎ গড়া যায় না; আবার কেবল অতীতের স্মৃতিতে আটকে থাকলেও চলবে না।

মহালয়ার দিনে তাই তর্পণের জল নিবেদনের পাশাপাশি নিজের বিবেকের কাছেও প্রশ্ন রাখা দরকার—আমরা কি আমাদের পূর্বসূরিদের কাছ থেকে পাওয়া মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করছি? দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি? পরিবারে প্রবীণদের মর্যাদা দিচ্ছি? সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই মহালয়ার তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে উঠতে পারে। অমাবস্যার অন্ধকার পেরিয়ে দেবীপক্ষের আলো আসুক মানুষের মনেও। পিতৃস্মরণ হোক কৃতজ্ঞতার, দেবীবন্দনা হোক ন্যায় ও সাহসের, আর দুর্গোৎসব হয়ে উঠুক মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার উপলক্ষ।

Tag
আরও খবর