মোংলা প্রতিনিধিঃ
বৈরী আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অবৈধ জালের দৌরাত্ম্যে বাগেরহাটসহ উপকূলীয় অঞ্চলে ইলিশের দেখা মিলছে না, যা জেলে ও আড়তদারদের দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাগেরহাটসহ গোটা উপকূলীয় অঞ্চলে ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ, যা স্থানীয় মৎস্য অর্থনীতিতে গভীর সংকট তৈরি করেছে। বঙ্গোপসাগরে বারবার সৃষ্ট লঘুচাপ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সাগর উত্তাল থাকায় জেলেরা নিয়মিত মাছ ধরতে পারছেন না, ফলে অধিকাংশ ট্রলার সাগরে না গিয়ে উপকূলে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক গতিপথ ও অভিবাসন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পশুর ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় অবৈধ বেহুন্দি জালসহ নানা ক্ষতিকর জাল পেতে রাখায় ঝাঁক বেঁধে ইলিশের উপকূলীয় নদ-নদীতে প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে, যার ফলে সাগর ও নদী উভয় ক্ষেত্রেই মাছের প্রাচুর্য আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। ট্রলারের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় এই অঞ্চলের জেলেরা গভীর সমুদ্রে গিয়ে মাছ আহরণেও ব্যর্থ হচ্ছেন, যা পাইকারি মাছের আড়তগুলোতে ইলিশের সরবরাহ তলানিতে নামিয়ে এনেছে।
জেলে ও আড়তদারদের অভিযোগ, উপকূলীয় মোহনাগুলোতে অবৈধ জালের অবাধ ব্যবহার এবং ভারতীয় ট্রলারের অনুপ্রবেশ ইলিশের বংশবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। স্থানীয় জেলেরা দাবি করছেন যে, শুধুমাত্র বাংলাদেশে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করলে ইলিশের প্রজনন সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, বরং এর জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে সাগরে অভিন্ন অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন। ট্রলার মালিকদের মতে, বড় বড় টোলিং জাহাজের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং জলসীমায় ভারতীয় জেলেদের অবৈধ অনুপ্রবেশের ফলে স্থানীয় জেলেরা তাদের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মাছের আকাল থাকায় ঋণের দায়ে জর্জরিত জেলে পরিবারগুলো এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে তারা পেশা বদল করতেও হিমশিম খাচ্ছেন। সরকারি প্রণোদনা হিসেবে চাল পেলেও তা দীর্ঘমেয়াদী এই সংকট উত্তরণে পর্যাপ্ত নয় বলে ভুক্তভোগীরা মনে করছেন।
জেলা মৎস্য বিভাগ ও সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, মোহনাগুলোতে বাধা এবং অবৈধ জালের ব্যবহার ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। মৎস্য বিভাগ তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, সুন্দরবন অঞ্চল মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদনের স্বার্থে গোটা সুন্দরবনের নদ-নদীতে সারা বছর মাছ আহরণ নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। তবে সুন্দরবন বন বিভাগের মতে, এই ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে কয়েক হাজার জেলে পরিবারের জন্য কার্যকর বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও, সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে মোহনাগুলোতে অবৈধ জাল নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না, যা মৎস্য সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইলিশের এই আকাল কেবল জেলেদের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে না, বরং জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ভরা মৌসুমেও মাছের এই দুষ্প্রাপ্যতা ভোক্তা পর্যায়ে ইলিশের দামকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে। যদি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং যৌথ জলসীমা ব্যবস্থাপনায় সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্য শিল্প ধসে পড়ার পাশাপাশি হাজার হাজার জেলে কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবং ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র পুনরুদ্ধারে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি এবং জেলেদের পুনর্বাসনের কোনো বিকল্প নেই।
১ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ৩৮ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ৪২ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ২০ মিনিট আগে