মোংলা প্রতিনিধিঃ
সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে হরিণ শিকারের ফাঁদ পাতার সময় চারজন পেশাদার শিকারিকে আটক করেছে বন বিভাগ, যার মধ্যে অন্যতম তালিকাভুক্ত শিকারি ফরিদ হাওলাদার।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অপপ্রয়াসে লিপ্ত একটি সক্রিয় শিকারি চক্রকে হাতেনাতে আটক করেছে বনরক্ষীরা। গত শনিবার ভোরে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের মৃগামারী খাল সংলগ্ন এলাকায় নিয়মিত টহল চলাকালীন বন বিভাগের বিশেষ দল এই অভিযান পরিচালনা করে। আটককৃত চার শিকারির কাছ থেকে হরিণ শিকারের জন্য ব্যবহৃত অসংখ্য ফাঁদ এবং বিপুল পরিমাণ কাঁকড়া জব্দ করা হয়েছে। বন বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বনরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করে এই চক্রটি দীর্ঘ সময় ধরে হরিণ শিকারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। আটককৃতদের মধ্যে মোংলা উপজেলার দক্ষিণ চিলা গ্রামের ফরিদ হাওলাদার, আতাউর খান, মোজাম জমাদ্দার এবং রুহুল জমাদ্দার রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরেই অসাধু উপায়ে বন্যপ্রাণী নিধনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে জানা যায়, আটককৃতদের মধ্যে ফরিদ হাওলাদার ওরফে টাকু ফরিদ সুন্দরবনের হরিণ শিকারি চক্রের অন্যতম মূলহোতা হিসেবে পরিচিত। বনের গহীন অঞ্চলে ফাঁদ পেতে হরিণ নিধনের মাধ্যমে তারা বন্যপ্রাণীর সংখ্যা হ্রাস করার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। ভুক্তভোগী স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, এই চক্রটি কেবল হরিণ শিকারই করে না, বরং বনের সংরক্ষিত এলাকায় অবৈধভাবে প্রবেশ করে কাঁকড়া শিকারের আড়ালে মূলত বন্যপ্রাণী পাচারের সিন্ডিকেট পরিচালনা করে। তাদের এই কর্মকাণ্ডের ফলে সুন্দরবনের প্রাণিকুল প্রতিনিয়ত হুমকিতে পড়ছে এবং সংরক্ষিত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোকেও তারা বারবার কাজে লাগাচ্ছে। আটককৃতদের নিকট থেকে জব্দকৃত সরঞ্জামগুলো প্রমাণ করে যে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং একটি পূর্বপরিকল্পিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রটিকে ধরার জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছিল এবং নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই এই সফল অভিযান পরিচালিত হয়। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, আটককৃতদের বিরুদ্ধে বন আইনে কঠোর মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাদের আইনের আওতায় এনে বাগেরহাট আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধে বন বিভাগ এখন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে এবং বনের প্রতিটি পয়েন্টে টহল আরও জোরদার করা হয়েছে। তবে কেবল আইনি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, বরং স্থানীয় জনপদ থেকে এই শিকারি চক্রের মূল উৎপাটন করতে হলে বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত ও ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।
সুন্দরবনের মতো সংরক্ষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে হরিণ শিকারের মতো ঘটনা কেবল আইন লঙ্ঘনই নয়, বরং জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের শামিল। এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, বন দস্যু ও শিকারিদের দৌরাত্ম্য এখনো সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হয়নি, যা ভবিষ্যতে সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানের জন্য একটি বড় অশনিসংকেত। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বন বিভাগের নিয়মিত টহল এবং স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধি না পেলে সুন্দরবনের হরিণসহ অন্যান্য প্রাণীরা অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে এবং অসাধু শিকারিদের মনে ভয়ের সঞ্চার করতে।
১ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৪২ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ১৮ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ৪৩ মিনিট আগে