শিবচর উপজেলা-এর বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে এবার ইরি-বোরো ধানের শীষ দুলছে ঠিকই, কিন্তু সেই শীষের ভেতর অনেক ক্ষেত্রেই নেই পরিপূর্ণ ধান। বাইরে থেকে সবুজ-সোনালি আভায় ভরা ক্ষেত দেখলে ভালো ফলনের আশা জাগে, অথচ ধান কাটা ও মাড়াইয়ের পর বেরিয়ে আসছে হতাশাজনক চিত্র—অধিকাংশ ধানই চিটা বা ফাঁপা। এতে চলতি মৌসুমে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন উপজেলার হাজারো কৃষক।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, অনেক জমিতে ধানের শীষে দানার পরিমাণ খুবই কম। কোথাও কোথাও অর্ধেকের বেশি ধান চিটা হয়ে গেছে। কৃষকদের ভাষ্য, মৌসুমজুড়ে তেল সংকট, সময়মতো সেচ দিতে না পারা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, ধানের শীষ বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খেতে পর্যাপ্ত পানি ছিল না। অনেক জমি শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে যায়। ফলে ধানের গোড়ায় প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা না থাকায় দানাগুলো পূর্ণতা পায়নি। বাইরে থেকে ক্ষেত ভালো দেখালেও মাড়াইয়ের পর প্রকৃত অবস্থা সামনে আসছে।
কৃষকদের অভিযোগ, চলতি মৌসুমে সেচ ব্যয় ছিল অত্যধিক। তেল সংকটের কারণে অনেক সময় সেচযন্ত্র চালানো সম্ভব হয়নি। বিদ্যুতের লোডশেডিংও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাচ্ছে না।
একাধিক কৃষক জানান, প্রতি বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে কয়েক হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু এখন যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তাতে উৎপাদন খরচই উঠবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটার মজুরি বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৮০০ টাকায় পৌঁছেছে। ফলন কম হলে এই ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।
কৃষকদের ভাষায়, কয়েক মাসের কঠোর পরিশ্রমের পর যদি ঘরে ধান না ওঠে, তাহলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে। অনেক পরিবারকে নতুন করে ঋণের বোঝা টানতে হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী মৌসুমে কেউ কেউ ধান চাষ কমিয়ে অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকতে পারেন বলেও জানান তারা।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ধানে চিটা হওয়ার পেছনে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব অন্যতম কারণ। ধানের ফুল আসা ও পরাগায়নের সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রা থাকলে দানার স্বাভাবিক গঠন ব্যাহত হয়। পাশাপাশি সেচ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আলীমুজ্জামান বলেন, “তেল সংকট ও সময়মতো বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণে অনেক কৃষক খেতে ঠিকভাবে পানি দিতে পারেননি। পাশাপাশি আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণেও কিছু জমিতে ধানে চিটা দেখা দিয়েছে। কৃষকদের ক্ষতি কমাতে মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতি না হয়, সে জন্য আগাম প্রস্তুতি ও বিকল্প পরিকল্পনা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের মতে, কৃষকদের সময়মতো সার, বীজ, তেল ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষিনির্ভর শিবচর অঞ্চলে কৃষক লোকসানের মুখে পড়লে তারা ধীরে ধীরে চাষাবাদ থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। এতে কৃষি অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে শুধু প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর না থেকে সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন এবং কৃষকের জন্য জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই হতে পারে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলার প্রধান উপায়।
১ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ১৩ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ৩৯ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ৫৬ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ৫৯ মিনিট আগে