শিক্ষা একটি দেশের মেরুদণ্ড। একটি সুসংগঠিত শিক্ষাব্যবস্থা জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখে। শিক্ষার্থী হলো আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। যেখানে অন্যান্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক উন্নত হচ্ছে, তবে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পড়ে আছে বই এবং মুখস্থ বিদ্যার মধ্যে। আমরা এখনো পুরোনো পদ্ধতির মধ্যে যাচ্ছি। আমরা এখনো শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা আর মার্কশীটের নম্বর বিবেচনা করে তাদের দক্ষতা যাচাই করি যেটা আসলে অযৌক্তিক। বর্তমান শিক্ষার্থীরা নতুন প্রযুক্তি সাথে পুরাতন শিক্ষাব্যবস্থার সাথে খাপখাইয়ে চলতে পারছে না। এভাবে চললে ভবিষ্যতে আমাদের দেশ কখনো এগিয়ে যেতে পারবে না। কোনো এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো, আমাদের দেশে এইচএসসি পাস উন্নত দেশের সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত তুলনা করা হয়েছে, যা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। তবে এর অনেকগুলো কারণ আছে।
প্রথমত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজ বিমুখ হয়ে যাওয়া। ইদানীং আমরা দেখি স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থী ওভাবে আসছে না বা নিয়মিতভাবে শ্রেণীকক্ষে আসে না। কারণ অনেক শিক্ষার্থী ধারণা স্কুল-কলেজ পড়ালেখা ঠিকভাবে হচ্ছে না। কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট টিচার কাছে পড়লে পড়াশুনা হবে এই জন্য শিক্ষার্থী শ্রেণীকক্ষে ফিরে যাচ্ছে না। এভাবে চললে সম্ভবত ৫-১০ বছরের মধ্যে স্কুল-কলেজ খালি হয়ে যাবে।
দ্বিতীয়ত হচ্ছে বাংলাদেশের করপোরেট সেক্টরের সাথে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মিল না থাকা। আমাদের দেশে করপোরেট সেক্টর এগিয়ে যাচ্ছে। তবে চাকরি ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখতে পারছি না। কারণ চাকরি বাজারে শুধু নম্বর বা মার্কশীট যাচাই বাছাই করে না, এর সাথে দেখে ঐ যুবক-যুবতীর দক্ষতা। যদি বাস্তবমুখী দক্ষতা না থাকে, তাহলে চাকরি প্রতিযোগিতায় ঠিকে থাকা কখনো সম্ভব হয়ে উঠে না। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কোনো রকম ঐ দক্ষতা নিয়ে কোনো সিলেবাস বা শেখানো হয় না। শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় পুঁথিগত জ্ঞান। যদি বাস্তবমুখী দক্ষতা আর শিক্ষা না পেয়ে থাকে, তাহলে সে চাকরি বাজারে মোকাবেলা করবে কীভাবে? এই পরিবর্তন আনতে হবে, না হলে এই শিক্ষা কোনো মূল্য থাকবে না।
তৃতীয়ত হচ্ছে সহশিক্ষা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অনাগ্রহী। শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান একজন শিক্ষার্থীকে বাস্তব সমাজে দক্ষ করে তুলতে পারে না। খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রেডক্রিসেন্ট, স্কাউটিং—এগুলো মানুষকে নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস, দলগত কাজ এবং মানবিক মূল্যবোধ শেখায়। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী এসব কার্যক্রম থেকে দূরে থাকছে, এবং অনেক প্রতিষ্ঠানও পর্যাপ্ত সুযোগ দেয় না। অভিভাবকরাও মনে করেন এগুলো সময় নষ্ট। ফলে তাদের সামাজিক দক্ষতা তৈরি হয় না। স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করলে একজন শিক্ষার্থী জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে, সমস্যা সমাধান করতে শেখে। এগুলো না থাকলে ভবিষ্যতে তারা আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বে পিছিয়ে পড়ে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য এই সহশিক্ষা ও সেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত আমাদের দেশে তথ্য প্রযুক্তি যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। শহরের স্কুল-কলেজে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার থাকার পরও গ্রামের স্কুল-কলেজগুলোতে এখনো তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে নাই। কারণ দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাব, অব্যবস্থাপনা, এবং ইন্টারনেট অবকাঠামোর দুর্বলতা গ্রামের স্কুল-কলেজে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছে না। আমাদের দেশে "মুক্তপাঠ" নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছিলো। যেখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কোর্স করে নতুন কিছু শিখতে পারবে। তবে সেই প্ল্যাটফর্ম বিভিন্ন আপডেট না থাকা এবং অব্যবস্থাপনা কারণে সেটি এখনো বন্ধ হয়ে আছে।
পঞ্চমত আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি ও অনিয়ম। আমরা সেই ছোটবেলা থেকে দুর্নীতি কথা সম্পর্কে জানি এবং দেখে আসছি। তবে দেশে দুর্নীতি আমরা কোনো ভাবে বন্ধ করতে পারছি না। ফলে এই দুর্নীতি ও অনিয়ম চলতে আছে। ফলে যোগ্য লোক আমরা পাচ্ছি না এবং যোগ্য শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারছি না। ফলে আমাদের দেশের মেধাবী ও যোগ্য লোক হয়তো বিদেশে পাড়ি জমায় অথবা বেকার হয়ে বসে থাকে। এভাবে হলে আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থা অচল হয়ে যাবে এবং দেশের অর্থনীতি পুরোপুরিভাবে নষ্ট হয়ে যাবে।
ষষ্ঠত হচ্ছে আমাদের দেশে পুরাতন শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থা পুরাতন থাকার কারণে আমাদের শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় অমনোযোগী হয়ে যাচ্ছে। শুধু এটা নয়, আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতি এইরকম একঘেয়েমিতার জন্য শিক্ষার্থী পড়ালেখা মনোযোগ দিতে পারছে না। শুধু এটা নয় পরীক্ষা পদ্ধতির কারণে অনেক শিক্ষার্থী চাপ সহ্য করতে পারে না। পরে তাকে আত্নহত্যা, নেশা ইত্যাদি পথ বেছে নিচ্ছে। এই পুরাতন শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করে নতুনভাবে শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করলে হয়তো শিক্ষার্থীদের মনে পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা সাময়িক নয়। ভবিষ্যত প্রজন্মের দক্ষতা, নৈতিকতা এবং আত্মবিশ্বাস আজই তৈরির সময়। স্কুল ও কলেজে শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা, সিলেবাসকে চাকরির বাজারের সাথে মিলানো, সহশিক্ষা কার্যক্রমে উৎসাহ বাড়ানো, দুর্নীতিকে কঠোরভাবে দমন করা, এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষা শুধু সনদপ্রাপ্তির মাধ্যম নয়, এটি মানুষ গড়ার একটি পরিপূর্ণ প্রক্রিয়া। যদি এখনই সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া না হয়, তবে আগামী দিনে আমরা দেখতে পাব দক্ষতাহীন এক প্রজন্ম, যা দেশের উন্নয়নকে থামিয়ে দেবে।
নাম: এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
ব্যাচ: ইউএমসি ০৭
সেশন: ২০২০-২১
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ
ও
রোভার মেট
আমরা স্কাউট গ্রুপ, ঢাকা