/ সম্পাদকীয় ও কলাম

উন্নয়নশীল দেশ গড়তে চাই শ্রমজীবী মানুষের অধিকার বাস্তবায়ন

সায়েম আহমাদ - রিপোর্টার

আপডেট: 01-05-2021 13:18:39

আজ পহেলা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। অন্যান্য দিবসের মতোই এটি একটি দিবস। যা শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে প্রতিবছর নানা আয়োজনে পালন করা হয় ।শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও দাবি আদায়ের দিন। প্রতিবছর বিশ্বের ৮০টির বেশি দেশে এই দিনটি পালিত হয়।


এই দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো সারা বিশ্বের সকল শ্রমিকের ন্যায়সঙ্গত অধিকার,দাবি, সুযোগ, নিরাপত্তা ও কর্ম পবিবেশ সুনিশ্চিত করা। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়। বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচিতে মুখর থাকতো রাজপথ। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ছুটিও রয়েছে। কিন্তু এবছর করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে দিবসটির সব কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।


তবে রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে গণমাধ্যমগুলোও বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। এই দিবসটি শুধু দিবস নয় যা এক অনুপ্রেরণা ও অধিকার আদায়ের নামও বটে। কারন এই দিবসটি হঠাৎ করে আসেনি যার পেছনে আছে হাজারো শ্রমিকদের ত্যাগ, তিতিক্ষা ও জীবনের দানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।এর এক হৃদয়বিদারক ইতিহাস হলো, ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা উপযুক্ত মজুরি আর দৈনিক আট ঘন্টা কাজের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। কল-কারখানা তখন গিলে খাচ্ছিল শ্রমিকের গোটা জীবন।


অসহনীয় পরিবেশে প্রতিদিন ১৬ ঘন্টা কাজ করতে হতো।সপ্তাহজুড়ে কাজ করে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে যাচ্ছিল। শ্রমজীবি শিশুরা হয়ে পড়েছিল কঙ্কালসার।তখন দাবি উঠেছিল, কল-কারখানায় শ্রমিকের গোটা জীবন কিনে নেয়া যাবে না। ৮ ঘন্টা শ্রম দিনের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের সময় ওই বছরের ১লা মে শ্রমিকরা ধর্মঘট আহবান করে।প্রায় তিন লাখ মেহনতি মানুষ ওই সমাবেশে অংশ নেয় তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে। কিন্তু আন্দোলনরত ক্ষুদ্ধ শ্রমিকদের রুখতে গিয়ে একসময় পুলিশ বাহিনী শ্রমিকদের মিছিলে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়।


এতে পুলিশের গুলিতে ১১ জন নিরস্ত্র শ্রমিক নিহত হন, আহত ও গ্রেফতার হন আরো অনেক শ্রমিক। পরবর্তীতে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে গ্রেফতারকৃত শ্রমিকদের মধ্য থেকে ছয়জনকে আন্দোলনে অংশ নেয়ার অপরাধে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। কারাগারে বন্দিদশায় এক শ্রমিক নেতা আন্মহননও করেন। এতে বিক্ষোভ আরো প্রকট আকারে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। ১৮৮৯ সালের ১৪ই জুলাই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৮৯০ সাল থেকে ১ মে বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’। 


যার প্রত্যক্ষ প্রভাব আজ বিদ্যমান সারাবিশ্বে সেখানেই মালিকরা শ্রমিকদের উপর অত্যাচার ও অধিকার আদায়ে টালবাহানা করে তখনই তারা আন্দোলন,সমাবেশের ডাক দেন যার মূল হলো সেই দিনের অনুপ্রেরণা। মে দিবস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভের মাধ্যমে সারা বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণির মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের ওপর এ দিবসের প্রভাব সূুদূর প্রসারী। এর প্রভাবে শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময় ১৬ ঘন্টা থেকে নেমে আসে ৮ ঘন্টায়। বিশ্বের সব দেশের শ্রমিকরা এর মাধ্যমে তাদের শ্রমের উপযুক্ত মর্যাদা পেতে শুরু করে।


নিজেদের অধিকার আদায়ে তারা এগিয়ে যায় সামনে। মেহনতি মানুষ মুক্তি পেতে শুরু করে তাদের শৃঙ্খলিত জীবন থেকে। বিশ্বের ইতিহাসে সংযোজিত হয় সামাজিক পরিবর্তনের আরেকটি নতুন অধ্যায়।মে দিবস হচ্ছে গোটা পৃথিবীর শ্রমজীবি সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সুচনা করার দিন। শ্রেণি-বৈষম্যের বেঁড়াজালে যখন তাদের জীবন বন্দি ছিল তখন মে দিবসের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খুলে যায় তাদের শৃঙ্খল। এ ফলে আস্তে আস্তে লোপ পেতে লাগলো সমাজের শ্রেণি-বৈষম্য। পুঁজিবাদের দূর্বল দিকগুলোকে পুঁজি করা অবৈধ অর্থলোভীদের আগ্রাসী দংশন থেকে রেহাই পেল কোটি কোটি শ্রমিক। বৈষম্য ও শোষণমুক্ত একটি সমাজ গোটা বিশ্বকে উপহার দিল এই মে দিবস। মালিকপক্ষের সাথে শ্রমিকের যে উঁচু-নিচু সম্পর্ক ছিল তা এক সময় সমতলে চলে আসলো শুধুমাত্র মে দিবসের স্বীকৃতির ফলেই।


বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা জানি গত দুই বছ যাবৎ পৃথিবী এক অশুভ শক্তির হাতে বন্দি যার ফলে সবকিছুতেই স্থীর অবস্থা বিরাজ করছে। সারা বিশ্বে এই সঙ্কটে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছে বিশ্বের মেহনতি মানুষ। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন আইএলও বলেছে, মহামারীর মধ্যে লকডাউনের কারণে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় বিশ্বে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ১৬০ কোটি শ্রমিকের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। এই কর্মীসংখ্যা বিশ্বের মোট শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেক। এতে বুঝাই যাচ্ছে মেহনতি মানুষরা আজ কঠিন সময় পাড় করছে।যদিও বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এই কঠিন সময়ে তাদের সকল নাগরিকদের খাদ্য, বস্ত্র, নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সুনিশ্চিত করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কর্মে ও ঘরে বসবাস করতে বলেছেন। উন্নত বিশ্বে কোন কাজকে নিচু করে দেখা হয়না সকলের জন্য আছে সমান মর্যাদা কিন্তু আমাদের দেশে শ্রমিকদের কাজের মর্যাদা দেওয়া হয়না।


বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য সম্ভব নয় কারন এই দেশগুলো তাদের সকল মানুষের পূণর্বাসন দিতে সক্ষম নয়। তাই আমাদের মতো এই স্বল্পোন্নত দেশে সরকার লকডাউন দিলেও তা মানা সম্ভব হচ্ছে না সাধারণ মানুষের যা আমাদের দেশে এক নিরব ঘাতকরূপে আর্বিভূত হয়েছে।এই দেশে শ্রমজীবি মানুষের সংখ্যা অনেক। বর্তমানে মে দিবসের সম্মানার্থে বাংলাদেশেও ১ মে সরকারী ছুটির দিন। এদিন শ্রমিকরা মহা উৎসাহ ও উদ্দীপনায় পালন করে মে দিবস। তারা তাদের পূর্বসূরীদের স্মরণে আয়োজন করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। শ্রমিক সংগঠনগুলো মে দিবসে আয়োজন করে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমুখী কর্মসূচির। বাংলাদেশের শ্রমিকরা এদিন আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করে মহান মে দিবস যা সম্ভব হয়নি এবার। সকলকে অবস্থান করতে হচ্ছে ঘরবন্দি ও কর্মহীন হয়ে।১৮৮৬ থেকে ২০২১ যা শ্রমের মর্যাদা, মূল্য ও ন্যায্য মজুরি শুধু নয়, যুক্তিসঙ্গত কর্ম সময় নির্ধারণের আন্দোলনের ১৩৫ বছর। গত ১৩৫ বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে মানুষের সমাজ ও সভ্যতার। কিন্তু, এই প্রশ্নের আজো উত্তর খুঁজতে হয়, এতো উন্নতি-অগ্রগতি সাধিত হলেও শ্রমিকের অধিকার কি উন্নত দেশগুলা ছাড়া তৃতীয় বিশ্বের সকল দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে মে দিবসের প্রধান দাবি ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস ২২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হলেও কোটি কোটি বেসরকারি শ্রমিক কর্মচারীরা এখনও কিন্তু তাদের অধিকার আদায় করতে পারেনি।


এখনো বাংলাদেশে বেসরকারি প্রতিষ্টানগুলোতে ১০/১২ ঘন্টা কর্মদিবস যা আমাদের শ্রমনিবিড় দেশে বহাল আছে। বাংলাদেশে এখনো শ্রমিকরা তার ন্যায্যমূল্য, অধিকার, সুযোগ সুবিধা এবং সুনিশ্চিত কর্মপরিবেশ পায়নি। কারন বাংলাদেশের ৮০% সম্পদ এখন ২০% মানুষের হাতে আর বাকি ২০% সম্পদ ৮০% মানুষের হাতে এতে বুঝা যায় যে বাংলাদেশে পুঁজিবাদের কালো ছায়ায় পতিত আছে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ।যার ফলে প্রায়ই শ্রমিক, মালিক বিদ্রোহ, হরতাল, মিছিল হয়।


শ্রমিকের অধিকার বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারন বাংলাদেশের জনসংখ্যা হার অনুপাতে চাকরি ও কর্ম পরিবেশের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।যার ফলে অনেক শ্রমিক আজ বেকার। পাশাপাশি বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশে উন্নিত হয়ে যার প্রত্যক্ষ অবদান আছে বিদেশে কর্মরত রেমিট্যান্স যুদ্ধাদের।যারা প্রতিবছর প্রচুর অর্থ দেশে প্রেরণ করে কিন্তু তাদের কিন্তু কোনো সুষ্ঠ, সুন্দর, কর্ম ও নিরাপত্তা পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি আমাদের সরকার। প্রায়ই সময় নিউজ পাওয়া যায় বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশ শ্রমিক কোন দুর্ঘটনা বা ঝুকিপূর্ণ কাজে মৃত্যুবরণ করেছে। পাশাপাশি এমন অনেক অমানুষিক খবর আসে যে তাদের উপর জুলুম - নির্যাতন ও অত্যাচার করা হচ্ছে কিন্তু আমাদের দেশের সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতি এতোটা সমৃদ্ধ নয় যে বিদেশে কর্মরত রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সুষ্ঠ, সুন্দর, সুনির্ধারিত কর্ম ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। যা আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে একটা বড় সমস্যা।


দেশে কিংবা দেশের বাইরে যাদের হাতে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি তাদের সুনিশ্চিত কর্ম ও নিরাপত্তা প্রদান করা শ্রমিক দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। তাই দেশের সরকার, প্রশাসন এবং আমাদের সকলকে আর্দশ সমাজ, দেশ বিনির্মাণে এগিয়ে আসতে হবে।মে দিবসে সকল শ্রমজীবি মানুষ তাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করার মাধ্যমে উন্নয়নমুখী পরিবর্তন সূচনার অঙ্গিকারের প্রয়াস পায়। 'জয় হোক সাম্যের, জয় হোক মেহনতি মানুষের'।



লুৎফর রহমান লাভলু

শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ঢাকা কলেজ শাখা।

Tag

Comments (0)

Comments