বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ভোমরা স্থলবন্দর প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বৈধ আমদানি-রপ্তানির জন্য পরিচিত। কিন্তু সেই বন্দরই আজ দেশের অন্যতম মাদক প্রবাহের বড় রুটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনের মতো মাদক এখানে প্রবেশ করছে, আর এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন বহুল আলোচিত “মাদক সম্রাট শামীম”।
বাবার হাত ধরে মাদকের শেকড়:
শামীমের উত্থান হঠাৎ নয়। তার বাবা আরশাদ আলী ভোদু ছিলেন সীমান্তের কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী। টুপি পরে প্রকাশ্যে ফেনসিডিল বিক্রি করতেন তিনি। পরিবারকে জড়িয়েছিলেন এই ব্যবসায়। স্ত্রী-সন্তান, জামাতা, আত্মীয় সবাই মিলে গড়ে তোলেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বাবার মৃত্যুর পর সেই নেটওয়ার্কের হাল ধরেন শামীম।
আজ তার অধীনে শতাধিক দালাল-বাহক কাজ করছে। স্থানীয় সূত্র জানায়—প্রতিদিন ভোমরা সীমান্ত দিয়ে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার মাদক পাচার হয় এবং তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে।
গ্রেপ্তার হলেও আইনের ফাঁক গলে মুক্তি:
গত ৮ জুন বিজিবির বিশেষ অভিযানে বিপুল ফেনসিডিলসহ ধরা পড়ে শামীম। কিন্তু আটকের পরপরই তার পরিবার ও আত্মীয়রা মাঠে নামে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও অপপ্রচারে। এমনকি বিজিবি সদস্যদের নারীঘটিত নাটক সাজিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু প্রমাণ মেলেনি।
অবশেষে লাখ লাখ টাকা খরচ করে জামিনে মুক্তি পান শামীম। এটি ছিল না প্রথম ঘটনা। আগেও ডজনখানেক মামলায় গ্রেপ্তার হলেও প্রতিবার আদালতের আশ্রয়ে জামিনে বেরিয়ে আসেন। মুক্তির পর পুরনো ব্যবসায় ফিরে যাওয়া তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
প্রশাসনের অসহায়তা ও নিষ্ক্রিয়তা:
ভোমরার সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ—প্রশাসনের একধরনের নিষ্ক্রিয়তায় মাদক ব্যবসায়ীরা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে।
বিজিবি ৩৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আশরাফুল হক বলেন, “আমরা প্রতিদিন বিশেষ টহল দিচ্ছি, প্রচুর মাদক জব্দ করছি। সীমান্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, “ভোমরার পুরো সীমান্ত বিজিবির নিয়ন্ত্রণে। তবুও পুলিশ মাদক দমনে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। মাদকের ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স।”
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় টিকে থাকা সিন্ডিকেট:
স্থানীয় সূত্রের দাবি—শামীম প্রতি মাসেই জেলার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের মোটা অঙ্কের টাকা দেন। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অনেক সময় নীরব থাকে। জনপ্রতিনিধিদের একাংশের বিরুদ্ধে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই চক্রের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
সামাজিক বিপর্যয়ের চিত্র:
অবাধ মাদক প্রবাহ যুব সমাজকে আসক্ত করছে। বাড়ছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও নারী নির্যাতনের মতো অপরাধ। পরিবারে অশান্তি, সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক মূল্যবোধের পতন ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
সমাধান কী?
সচেতন মহল মনে করে—
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া মাদক সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়।
বিজিবি, পুলিশ, র্যাব ও কাস্টমসকে সমন্বিতভাবে অভিযান চালাতে হবে।
আইন সংস্কার করে জামিনের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
সীমান্তবাসীদের সম্পৃক্ত করে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
উপসংহার:
শামীম কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি সীমান্তের দীর্ঘদিনের মাদক সাম্রাজ্যের প্রতীক। প্রশাসন মাঝে মাঝে তাকে গ্রেপ্তার করলেও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় তিনি বারবার মুক্তি পান। স্থানীয়দের মতে—সৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ভোমরার মাদক সাম্রাজ্য ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
৪ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে
২০ ঘন্টা ২০ মিনিট আগে
২২ ঘন্টা ৪৬ মিনিট আগে
১ দিন ৫৩ মিনিট আগে
২ দিন ২ ঘন্টা ৪ মিনিট আগে
২ দিন ১৮ ঘন্টা ২৫ মিনিট আগে