শ্রীমঙ্গলে সরকারি হাসপাতালের অনিয়ম নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন ও তথ্য অধিকার আইনে তথ্য চাওয়ার পর মামলা; নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিক মো. এহসানুল হকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। মামলাটিকে হয়রানিমূলক দাবি করে তা প্রত্যাহারের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।
মামলার বাদী শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সদ্য বদলিকৃত সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. সিনথিয়া তাসমিন। গত ২৫ অক্টোবর সিলেট সাইবার সিকিউরিটি আদালতে তিনি মামলাটি দায়ের করেন। মামলা নম্বর ২১২/২৬।
মামলার তিন নম্বর আসামি করা হয়েছে দৈনিক ‘খোলা কাগজ’ ও 'দেশচিত্র' পত্রিকার মৌলভীবাজার জেলা স্টাফ রিপোর্টার এবং শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের যুগ্ম সদস্য সচিব মো. এহসানুল হককে, যিনি এহসান বিন মুজাহির নামেও পরিচিত।
সাংবাদিক এহসানের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গল সরকারি হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম ও সেবার মান নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় তিনি হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম সম্পর্কে ১১টি বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করেন। এসব তথ্যের মধ্যে ছিল বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ, প্যাথলজি ও ভর্তি রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা ফির সরকারি চালানের কপি, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও দরপত্র, জ্বালানি খরচ, রোগীর পরিসংখ্যান, বাড়িভাড়া জমা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা এবং আইপিএস ও ব্যাটারি চুরির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন।
তিনি দাবি করেন, হাসপাতালের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ এবং বিভিন্ন তথ্য চাওয়ার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ এনে মামলাটি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এহসানের প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে রয়েছে—হাসপাতালে মেয়াদহীন পাউরুটি ও নিম্নমানের কলা সরবরাহ, রাতেও সরকারি হাসপাতালে জাতীয় পতাকা ওড়ানো, হাসপাতালের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা, জেনারেটর ও আইপিএস অচল থাকায় মোমবাতির ওপর নির্ভরতা, এমএসআর সামগ্রী সরবরাহ নিয়ে বিতর্ক এবং ডা. সিনথিয়ার বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি ওঠার মধ্যেই তার বদলির বিষয়টি।
নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সাংবাদিক এহসানুল হক বলেন, চাঁদা দাবি কিংবা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করে আসছেন। মামলা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ থেকে তাকে বিরত রাখা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সিআইডি, পিবিআইসহ সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার প্রতি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে, আদালত ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে দৈনিক জনবাণীর মৌলভীবাজার প্রতিনিধি মঞ্জু বিজয় চৌধুরীকে। দ্বিতীয় আসামি বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের নেতা মোজাহিদুল ইসলাম। তৃতীয় আসামি সাংবাদিক এহসানুল হক। এছাড়া ‘জেন জেড শ্রীমঙ্গল’ নামের একটি পরিচয়কে চতুর্থ এবং প্রবাসী আমির আলীকে পঞ্চম আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে বিভিন্ন বেনামি ও মিথ্যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মানহানিকর প্রচারণা চালিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পোস্ট সরিয়ে ফেলার বিনিময়ে অর্থ দাবি করার অভিযোগও আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সাইবার সুরক্ষা আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করে পুলিশ অথবা সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের আবেদন করা হয়েছে।
তবে মামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মঞ্জু বিজয় চৌধুরী ও মোজাহিদুল ইসলাম। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা জানান, হাসপাতালের অনিয়ম, দুর্নীতি ও কথিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সঠিক তদন্তের দাবি জানানো হয়েছিল। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তের পরিবর্তে তাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে তারা ডা. সিনথিয়া তাসমিনের পূর্ববর্তী ও শ্রীমঙ্গলে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে কথিত অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, চাকরিবিধি লঙ্ঘন এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের সাংবাদিক সমাজে আলোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের দাবি, সংবাদ প্রকাশ ও তথ্য অনুসন্ধানের কারণে কোনো সাংবাদিক যেন হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মামলার অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
১ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে
৮ ঘন্টা ২০ মিনিট আগে
৮ ঘন্টা ২৩ মিনিট আগে
১৮ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে