মুন্সি শাহাব উদ্দীন, চট্টগ্রাম
আশি কিংবা নব্বইয়ের দশক সময়টা যেন আজকের ব্যস্ত পৃথিবীর কাছে এক হারিয়ে যাওয়া গল্প। তখন জীবন ছিল সহজ, চাওয়া-পাওয়া ছিল অল্প, কিন্তু আনন্দ ছিল অনেক বেশি। হাতে স্মার্টফোন ছিল না, ঘরে ইন্টারনেট ছিল না, টেলিভিশনও ছিল সবার নিত্যসঙ্গী নয়। তবুও মানুষের মুখে হাসির কমতি ছিল না। তখন সকাল শুরু হতো পাখির ডাক আর মায়ের মমতামাখা ডাকে। ঘুম থেকে উঠে উঠানে বসে নাশতা, তারপর বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ছুটে যাওয়া। বিকেল হলেই পাড়ার ছেলেমেয়েরা এক জায়গায় জড়ো হতো। গোল্লাছুট, কানামাছি, দাড়িয়াবান্ধা, লুকোচুরি, মার্বেল কিংবা ফুটবল খেলার যেন শেষ ছিল না। হার-জিত নিয়ে সামান্য অভিমান হতো, আবার কিছুক্ষণ পরেই সবাই একসঙ্গে হাসতে হাসতে খেলায় মেতে উঠত। তখন কারও হাতে মোবাইল ফোন ছিল না, কিন্তু একে অন্যের খোঁজ নিতে মানুষের কোনো অসুবিধা হতো না। কারও বাড়িতে অতিথি এলে পাড়া-প্রতিবেশীর সবাই যেন আপনজন হয়ে যেত। কারও ঘরে রান্না হলে পাশের বাড়িতেও তার গন্ধ পৌঁছে যেত, আর অনেক সময় খাবারও পৌঁছে যেত থালায় করে গ্রামের জীবন ছিল আরও বেশি আপন। সন্ধ্যা নামলেই উঠানে পাটি বিছিয়ে বসত গল্পের আসর। দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা শোনাতেন রূপকথা, ভূতের গল্প কিংবা পুরোনো দিনের কাহিনি। শিশুরা মুগ্ধ হয়ে শুনত। বিদ্যুৎ চলে গেলে বিরক্তি নয়, বরং হারিকেনের আলোয় গল্প করার আনন্দই ছিল আলাদা।
তখন চিঠিরও ছিল আলাদা আবেগ। দূরে থাকা প্রিয়জনের একটি চিঠি হাতে পাওয়া মানেই ছিল আনন্দের উৎসব। চিঠির প্রতিটি শব্দ বারবার পড়া হতো। অপেক্ষারও যেন একটা সৌন্দর্য ছিল। আজকের মতো মুহূর্তেই বার্তা পৌঁছে যেত না, কিন্তু মানুষের অনুভূতিগুলো হয়তো আরও গভীর ছিল। বাজারে গেলে পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হতো। দোকানদার শুধু ক্রেতা হিসেবে দেখতেন না, মানুষ হিসেবেও চিনতেন। প্রতিবেশীর সুখে আনন্দ আর দুঃখে পাশে দাঁড়ানো ছিল সামাজিক জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। কারও বাড়িতে বিপদ এলে খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগত না মানুষ ছুটে যেত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে।
তখন জীবন ছিল কষ্টের, কিন্তু সেই কষ্টের মধ্যেও ছিল তৃপ্তি। নতুন জামা মানেই উৎসব, নতুন জুতা মানেই আনন্দ, ঈদের সকালে নতুন পোশাক পরে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো মানেই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ। আজ আমাদের হাতে আধুনিক প্রযুক্তি, মুহূর্তে যোগাযোগের সুযোগ, বিনোদনের অসংখ্য মাধ্যম। জীবন অনেক সহজ হয়েছে, কিন্তু কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেই নির্ভেজাল আনন্দ। মানুষ কাছাকাছি থেকেও দূরে সরে গেছে। একই ঘরে বসে সবাই নিজের নিজের মোবাইলের পর্দায় ডুবে থাকে।
আশি-নব্বইয়ের দশক হয়তো ফিরে আসবে না। ফিরে আসবে না সেই বিকেলের মাঠ, হারিকেনের আলো, পাড়ার আড্ডা কিংবা চিঠির অপেক্ষা। কিন্তু সেই সময়ের ভালোবাসা, আন্তরিকতা আর সহজ জীবনযাপনের শিক্ষা আজও আমাদের জন্য অমূল্য। সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলেছে, মানুষ বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে। তবুও মাঝেমধ্যে মনে হয় এত কিছু পাওয়ার পরও যদি ফিরে যাওয়া যেত সেই আশি-নব্বইয়ের দিনে, যেখানে চাওয়া ছিল কম, সম্পর্ক ছিল গভীর আর সামান্যতেই মন ভরে যেত।
সেই দিনগুলো হয়তো সত্যিই ছিল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়—যেখানে জীবন ছিল সহজ, মানুষ ছিল আপন, আর সুখ ছিল হাতের মুঠোয়।
৬ ঘন্টা ১২ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ২১ মিনিট আগে
৩০ দিন ১৪ ঘন্টা ৪ মিনিট আগে
৪১ দিন ১৭ ঘন্টা ২৫ মিনিট আগে
৪৬ দিন ২২ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে
৭৭ দিন ২০ ঘন্টা ২৮ মিনিট আগে
৮৯ দিন ১৩ ঘন্টা ৪৭ মিনিট আগে
৯০ দিন ১৯ ঘন্টা ৪২ মিনিট আগে