হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডজুড়ে কান্নার শব্দ, উদ্বিগ্ন স্বজনদের ছুটোছুটি আর চিকিৎসকদের ব্যস্ততা—মাদারীপুরে এখন যেন এটাই প্রতিদিনের চিত্র। কয়েক দিন আগেও সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করা যে অসুখ, সেটিই এখন আতঙ্ক হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে শিশুদের মধ্যে। একের পর এক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে হামে। কেউ কোলে জ্বরাক্রান্ত সন্তান নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় বসে আছেন, কেউ আবার অপেক্ষা করছেন চিকিৎসকের আশ্বাসের জন্য।
একসময় টিকাদানের মাধ্যমে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকা এই সংক্রামক রোগ আবারও উদ্বেগজনকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা। জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। চিকিৎসকদের মতে, সচেতনতার অভাব এবং সময়মতো টিকা না নেওয়াই পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
এই পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র এখন স্পষ্ট মাদারীপুরেও। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন হামে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় হামে আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৩৬৫ ছাড়িয়েছে, যার বেশিরভাগই শিশু।
শুক্রবার সকালে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডজুড়ে উদ্বিগ্ন স্বজনদের উৎকণ্ঠাময় উপস্থিতি। কেউ শিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য। হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা ইউনিট চালু করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৩২ শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছে তিনজন, আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৪ শিশু।
চিকিৎসকরা জানান, আক্রান্ত শিশুদের অনেকেরই উচ্চ জ্বর, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, তীব্র কাশি এবং শরীরে দানা ওঠার মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। কারও অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৩৬ জন শিশুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। এরই মধ্যে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে, যা অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. অখিল সরকার বলেন, “হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও সময়মতো চিকিৎসা ও সঠিক পরিচর্যা পেলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। শিশুর শরীরে উপসর্গ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত তরলজাত খাবার খাওয়ানোও জরুরি।”
তিনি আরও জানান, হামের প্রতিরোধে সরকারিভাবে টিকাদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ জেলা সদর হাসপাতালে পর্যাপ্ত টিকা মজুদ আছে। তবে এখনও অনেক অভিভাবকের মধ্যে টিকা বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানে ঘাটতি, ঋতু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণেই হামের সংক্রমণ বাড়ছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
জেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলেও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানা গেছে। অনেক পরিবার প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছে, পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে আসছে। এতে রোগ জটিল আকার ধারণ করছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্য বিভাগ নজরদারি জোরদার করেছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে প্রচারণা চালিয়ে অভিভাবকদের শিশুদের টিকাদানে আরও সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাদারীপুরে হামের এই বাড়তি সংক্রমণ এখন শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সময়মতো টিকাদানই পারে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে
১ ঘন্টা ৩৮ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ৩৩ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে
৬ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ৮ মিনিট আগে