জামালপুরের ইসলামপুরে শ্রাবণ নামে এক পথশিশু কুকুরের সঙ্গে বসবাস করে আসছিল। এতে সাত বছর বয়সী শ্রাবণের জীবন ঝুঁকির শঙ্কা দেখা দেয়। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল হুসাইনের নজরে আসে। তাঁর মহানুভবতায় কুকুরের সঙ্গ ছেড়ে শ্রাবণ এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে।
গত রোববার (২৬ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ইউএনও নাজমুল হুসাইনের তত্ত্বাবধানে সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে পুলিশী পাহারায় শ্রাবণকে জামালপুরের সমন্বিত শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রাবণের বাড়ি শেরপুর সদর উপজেলার কুসুমহাটি এলাকায়। পাঁচ বছর বয়সে তাঁর মা মারা যান। বাবা রবিউল ইসলাম অন্যত্র বিয়ে করেন। সৎ মায়ের অত্যাচারে বাড়ি ছাড়ে শ্রাবণ। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে তাঁর ঠিকানা হয়ে ওঠে ইসলামপুর রেলওয়ে স্টেশন। যেখানে স্বজনরূপে সঙ্গী হওয়ার কথা কোনো মানুষের, সেখানে তাঁর সঙ্গী হয়ে ওঠে দুইটি কুকুর।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ইসলামপুর রেলস্টেশনে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের আনাগোনা, ট্রেনের হুইসেল আর ব্যস্ততা ভিড়ে কুকুরের সঙ্গে মিতালিতে সময় পার করছিল কিশোর শ্রাবণ। তাঁর জীবনের গল্পটা সার্কাসের সবগুলো খেলাকে যেন পিছু ফেলে দেয়। ফলে অন্য কিশোরদের চেয়ে তাঁর জীবন যেমন আলাদা। তেমনই ব্যতিক্রমী। মানুষের ভিড়ে থেকেও সে যেন মানুষহীন, তবে সে একেবারে একা নয়। তাঁর জীবনের সবচেয়ে কাছের সঙ্গী ছিলো দুইটি কুকুর। তাঁর আশপাশেই ঘোরে এই কুকুর দুটি।
কখনো কুকুরকে ঘোড়া বানিয়ে শ্রাবণ সোয়ার হয়েছে। কখনো কুকুরাে বালিশ বানিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আবার কখনো কখনো কুকুরের মুখে হাত ঢুকে দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে। গত সাত মাস ধরে এভাবেই ইসলামপুর রেলস্টেশন এলাকায় কুকুরের সঙ্গে শ্রাবণের ছিলো নাওয়া-খাওয়া, ঘুম আর দিনাতিপাত।
স্থানীয়রা জানান, শ্রাবণ নিজের খাবারের অংশ ভাগ করে দেয় কুকুর দুটিকে। মানুষের কাছে হাত পেতে সংগ্রহ করা খাবারের বেশির ভাগ অংশই চলে যায় কুকুরের পেটে। কুকুর খেতে পারলেই শ্রাবণ তৃপ্তি পায়। অভাবের মাঝেও ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। রাতে যখন স্টেশন জনমানবহীন হয়ে যায়, তখন শ্রাবণ আর তার দুই সঙ্গী জড়িয়ে থাকে একে অপরের উষ্ণতায়।
রেলস্টেশনে এমন দিনাতিপাত দেখে স্থানীয় কয়েকজন যুবক শ্রাবণের পাশে এসে দাঁড়ায়। তাঁরা নিজস্ব উদ্যোগে শ্রাবণকে তার পরিবারের সন্ধান করে তাঁদের কাছে পৌঁছে দেন। কুকুরদ্বয়ের টানে ও সৎ মায়ের অত্যাচারে দুদিন পরেই আবারও ইসলামপুরে চলে আসে শ্রাবণ। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তাঁর কেটে যায় প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে কিংবা কোনো এক কোণে। জীবন তাঁকে দিয়েছে একাকিত্ব, কিন্তু সেই শূন্যতা পূরণ করেছে তার দুই নীরব বন্ধু।
মানুষের ভিড়ে থেকেও কখনো কখনো মানুষই হয়ে ওঠে একা। তবে ভালোবাসা থেমে থাকে না, তা খুঁজে নেয় নিজের পথ। ইসলামপুর রেলস্টেশন শ্রাবণের জীবনে সেই ভালোবাসার জায়গা। অভাব, অনটন আর ভয়ংকর অনিশ্চয়তার মাঝেও স্টেশনের দুটি বোবা প্রাণীর সঙ্গেই এগিয়ে চলেছিল শ্রাবণের জীবন।
উপজেলা শিশুসুরক্ষা সমাজকর্মী আনোয়ার হোসেন বলেন, 'ইউএনও স্যারের দিকনির্দেশনায় পুলিশী পাহারায় শ্রাবণকে জামালপুর সমন্বিত শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।'
ইউএনও নাজমুল হুসাইন বলেন, 'শ্রাবণ নামে এক শিশু কুকুরের সঙ্গে বসবাস করে আসছে জেনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের নৈতিক অঙ্গীকার। আমরা বলতে চাই, 'শিশুসুরক্ষা করতে হবে—এটা শুধু একটি কথা নয়, বরং আমাদের সবার দায়িত্ব। শিশুরা নিরাপদ থাকলেই একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠবে। শিশুর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা, অবহেলা ও শোষণ রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে আমরা বদ্ধপরিকর।'
১ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ৪২ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ৪৯ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ৮ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ২ মিনিট আগে