ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মার বুকজুড়ে ভেসে ওঠে নতুন দিনের ছবি। কোথাও জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চর, কোথাও আবার নদীগর্ভে বিলীন হওয়া বসতভিটার স্মৃতি। নদীর এই নির্মম সৌন্দর্য যেন প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—পদ্মা যেমন দেয়, তেমনি কেড়েও নেয়।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পদ্মা তীরবর্তী চরাঞ্চলের মানুষের জীবন যেন প্রকৃতির সঙ্গে অবিরাম এক যুদ্ধ। নদীভাঙন, দারিদ্র্য, যোগাযোগ সংকট, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার অভাব—সব মিলিয়ে তাদের প্রতিটি দিন কাটে অনিশ্চয়তার ছায়ায়। পদ্মার ভাঙন এখানে নতুন কিছু নয়; বরং এটি এক চক্রের মতো। একদিকে ভাঙে, অন্যদিকে গড়ে ওঠে নতুন চর। কিন্তু এই গড়ার পেছনে থাকে বহু পরিবারের সর্বস্ব হারানোর বেদনা।
ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন নতুন করে বসতি গড়ার সুযোগের জন্য। কেউ কেউ এক দশকেরও বেশি সময় পর আবার নদীর বুকে জেগে ওঠা জমিতে ফিরে এসে নতুন ঘর তোলেন। তবে সেই ঘরও কতদিন টিকবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
চরজানাজাত ইউনিয়নের বাসিন্দা কালাম বেপারী (৫৭) বলেন, “তিনবার নদীভাঙনে ঘর হারাইছি। এখন অন্যের জমিতে চাষ করি, মাছ ধরি। জীবনটা যেন নদীর স্রোতের মতো ভাসে।”
চরাঞ্চলের মানুষের অন্যতম বড় সমস্যা যোগাযোগব্যবস্থা। অধিকাংশ এলাকায় নেই পাকা সড়ক। নৌকাই একমাত্র ভরসা। বর্ষা এলেই নদীর স্রোত বাড়ে, তখন যাতায়াত হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
কাঠালবাড়ি ইউনিয়নের রাজা মিয়া বলেন, “অসুস্থ মানুষ নৌকায় করে হাসপাতালে নিতে হয়। অনেক সময় পৌঁছাতে পৌঁছাতে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।”
শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগও কম নয়। প্রতিদিন নদী পাড়ি দিয়ে স্কুল-কলেজে যেতে গিয়ে অনেকে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। ফলে ঝরে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী। কলেজছাত্রী মিম আক্তার বলেন, “চর থেকে উপজেলা সদরে গিয়ে পড়াশোনা করা খুব কষ্টের। নিয়মিত যাওয়া সম্ভব হয় না।”
পদ্মার চর মানেই উর্বর জমি। নতুন জেগে ওঠা চরে ভুট্টা, পেঁয়াজ, বাদাম, তরমুজ, ধানসহ নানা ফসল ফলছে। অনেক জায়গায় হাজার হাজার একর জমি এখন চাষের আওতায় এসেছে। তবে প্রকৃতিনির্ভর জীবনে নিশ্চয়তা নেই। একদিকে খরা, অন্যদিকে বন্যা কিংবা আকস্মিক ভাঙন—যে কোনো সময় ফসল হারানোর শঙ্কা থাকে। ফলে আয় থাকলেও সঞ্চয় নেই, নিরাপত্তা নেই। পদ্মা সেতু নির্মাণের পর নদীর গতিপথ পরিবর্তনের প্রভাবে শিবচরের বিভিন্ন এলাকায় নতুন চর জেগে উঠেছে। এসব এলাকায় নতুন করে বসতি গড়ছেন ভাঙনকবলিত মানুষ।
হিরাখার বাজার এলাকায় ইতোমধ্যে প্রায় ৯০০ পরিবার বসবাস শুরু করেছে। কেউ টিনের ঘর তুলেছেন, কেউ বাঁশের বেড়া দিয়ে আশ্রয় বানিয়েছেন। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে সবার চোখে একই প্রশ্ন—এই মাটিও কি টিকবে? ঐ গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, “পাকা ঘর করার সাহস পাই না। যদি আবার ভেঙে যায়?”
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক চর এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, নেই পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। আধুনিক বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার বাইরে পড়ে আছে যেন এই জনপদগুলো।
স্থানীয়দের দাবি, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, স্থায়ী সড়ক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া চরবাসীর জীবনমান বদলানো সম্ভব নয়।
সব কষ্টের পরও চরবাসী হার মানেন না। নদীভাঙনে ঘর হারিয়ে আবার ঘর তোলেন, জমি হারিয়ে আবার চাষ শুরু করেন। তাদের জীবনসংগ্রাম বাংলাদেশের প্রত্যন্ত জনপদের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
পদ্মার বুকে গড়ে ওঠা এসব চর যেন দেশের এক ভিন্ন বাস্তবতা—যেখানে প্রতিদিন বেঁচে থাকা মানেই নতুন করে লড়াই শুরু করা, আর নতুন ভোর মানেই আবারও স্বপ্ন দেখার সাহস।
১ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৫ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ২১ মিনিট আগে
১ দিন ৩ ঘন্টা ৪৬ মিনিট আগে
১ দিন ২৩ ঘন্টা ২৪ মিনিট আগে
১ দিন ২৩ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে