লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে রাজস্ব আয় ৫ লাখ ২৮ হাজার ৫০৯ টাকা
পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে মৌলভীবাজারের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছে। জেলার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, বধ্যভূমি৭১, বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্রসহ প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভিড় জমিয়েছেন বিপুল সংখ্যক পর্যটক ও দর্শনার্থীরা।
বিশেষ করে শ্রীমঙ্গলের বধ্যভূমি৭১, চা গবেষণা কেন্দ্র, কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক ও বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতে শিশু-কিশোরসহ সব বয়সের মানুষের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো।
সোমবার (২৩ মার্চ) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বধ্যভূমি৭১ ও চা গবেষণা কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে সব বয়সের মানুষের উপচেপড়া ভিড়। পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ট্যুরিস্ট পুলিশসহ প্রশাসনের সার্বিক নিরাপত্তা থাকায় বাড়তি স্বস্তি নিয়ে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদের ছুটিতে জেলার পাঁচ তারকা মানের হোটেল দুসাই রিসোর্ট, গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্ট, থ্রি স্টার মানের প্যারাগন, লেমন গার্ডেন রিসোর্টসহ ছোট বড় সব হোটেল- মোটেল, কটেজ এবং রিসোর্টে পর্যটকদের প্রচুর সমাগম বেড়েছে। হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ শতভাগ বুকিং সম্পন্ন হওয়ায় শত কোটি টাকার ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন জেলার পর্যটন ব্যবসায়ীরা।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কমলগঞ্জ ও বড়লেখা রেঞ্জ কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে গত তিন দিনে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত থেকে সরকারের বিপুল রাজস্ব আয় হয়েছে।
এর মধ্যে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ঈদের দিন থেকে আজ সোমবার পর্যন্ত বিদেশি পর্যটকসহ মোট ৪ হাজার ৭২৪জন পর্যটক টিকিট কেটে প্রবেশ করেছেন। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে মোট ৫ লাখ ২৮ হাজার ৫০৯ টাকা ।
সরজমিন বিভিন্ন পর্যটন স্পট ঘুরে দেখা গেছে, পরিবার-পরিজন ও প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের ছুটি কাটাতে নারী-পুরুষ, শিশুসহ সব বয়সি মানুষের উপচেপড়া ভিড় ছিল জেলার পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর ভিড় চায়ের রাজ্যখ্যাত শ্রীমঙ্গল উপজেলার বধ্যভূমি৭১, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই), বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন (সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা), সাত রং-এর চায়ের স্টল নীল কণ্ঠ, বাইক্কা বিল, চা-কন্যার ভাস্কর্য, কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি কালুকি হাওর, কুলাউড়ার পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি, রাজনগর উপজেলার কমলা রাণীর দীঘি, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাসিমপুর পাম্প হাউস এবং মৌলভীবাজার শহরের দৃষ্টিনন্দন স্পট শান্তিবাগ ওয়াকওয়ে, মাতারকাপন সুইচ গেটসহ জেলার বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে। ঈদের দিন সকাল থেকে আজ সোমবার পর্যন্ত এসব স্পটগুলোয় পর্যটন মুখর ছিল।
এই তিন দিনেই দেখা গেছে, শ্রীমঙ্গল ভানুগাছ সড়কের রেলগেট এলাকা থেকে গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্টের সামনে পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দীর্ঘ যানজট। পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গলে পর্যটকদের বিপুল সমাগমে সড়কে দীর্ঘ যানজট লেগেই ছিল। দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে অনেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বিভিন্ন যানবাহন থেকে প্রায় দেড় কলোমিটার এলাকা হেঁটে আগত পর্যটকরা বধ্যভূমি ও বিটিআরআই চা বাগান এলাকা ঘুরে দেখেন।
ঢাকা থেকে আগত ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, পরিবার নিয়ে তিনি ভ্রমণে এসেছেন। দীর্ঘ সময় জ্যামে বসতে বসতে অবশেষে ভানুগাছ রোড ১০ নম্বর পয়েন্ট থেকে হেঁটে হেঁটে বধ্যভূমির দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ভানুগাছ রোড রেলক্রসিং এর সামনে থেকে একটু এগোতেই দেখি দীর্ঘ যানজট। অনেক সময় বসে বসে থেকে পরিবার নিয়ে হেঁটেই রওনা দিলাম বধ্যভূমি ও বিটিআরআই চা বাগানে।
ইকো ট্যুরিস্ট গাইড আব্দুল আহাদ বলেন, ঈদের ছুটিতে সব পর্যটনকেন্দ্রে প্রচুর পর্যটকের আগমন হয়। বিশেষ করে লাউয়াছড়া উদ্যানে ঈদের দিন বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যটকদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়। আজ সোমবার পর্যন্ত উপচেপড়া ভিড় ছিল এ উদ্যানে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ ব্যবস্থাপনা নির্বাহী কমিটির কোষাধ্যক্ষ জনক দেববর্মা জানান, ঈদের ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। বনের পরিবেশ রক্ষা এবং পর্যটকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে বনকর্মী ও সিপিজি সদস্যরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।
একই চিত্র দেখা গেছে বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতেও। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবসহ নানা বয়সী মানুষ বাস, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন ধরণের ছোট-বড় যানবাহনে করে মাধবকুন্ডে আসছেন। পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতির ফলে দোকানগুলোতে জমজমাট বেচাকেনা চলছে। জলপ্রপাতের পানিতে নানা বয়সী মানুষ সাঁতার কাটছেন, হইচই করার পাশাপাশি প্রিয়জনদের ছবি ক্যামেরাবন্দি করছেন। কিশোর-যুবকরা মেতেছেন জলখেলায়। এ সময় পর্যটকদের মিলনমেলায় মুখরিত হয়ে ওঠে জলপ্রপাত এলাকা।
মাধবকুন্ডে আগত শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীকে বাড়তি আনন্দ দিয়েছে মাধবকুন্ডের ভেতরে থাকা ঘোড়া। ঘোড়ায় চড়ে পর্যটকরা আনন্দ উপভোগ করছেন।
মাধবপুর থেকে ঘুরতে আসা চাকরিজীবী হাসান আহমদ বলেন, মাধবকুন্ড আসার পথের রাস্তা পাশের চা বাগানের মনোরম দৃশ্য, খাসিয়া পুঞ্জি আর প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো মুগ্ধ করেছে। কুমিল্লা থেকে বেড়াতে আসা ব্যবসায়ী কামরান হোসেন বলেন, ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে মাধবকুন্ড বেড়াতে এসেছি। অনেক ভালো লেগেছে। তবে এখানকার সুযোগ-সুবিধা আর একটু বৃদ্ধি করলে আরও ভালো হতো।
সিলেটের এক কলেজ শিক্ষক জানান, দেশের অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র মাধবকুন্ড জলপ্রপাত। এখানকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে উন্নয়নে নজর দেওয়া হলে এ পর্যটন ক্ষেত্রটি দেশের অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করছি। মাধবকুন্ডের ব্যবসায়ী রাহেল আহমদ বলেন, ঈদুল ফিতরের ছুটিতে হাজারো পর্যটকের আনাগোনায় মুখরিত হয়েছে মাধবকুন্ড জলপ্রপাত। পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতিতে আমাদের ব্যবসা অনেক ভালো হয়েছে।
মাধবকুন্ড জলপ্রপাতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ট্যুরিস্ট পুলিশ বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় আমরা কাজ করছি। পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে মাধবকুন্ড জলপ্রপাত ঘুরে দেখতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।
জেলার পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানের একমাস আগে থেকেই ফাঁকা ছিল পর্যটনকেন্দ্রগুলো। তবে ঈদের ছুটি শুরু হতেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে পর্যটনকেন্দ্রগুলো। এবার ঈদেও ছুটির শেষ দিন পর্যন্ত লাখো পর্যটক মৌলভীবাজার ভ্রমণে আসতে পারেন এবং প্রায় শতকোটি টাকার ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
লাউয়াছড়া টিকিটি কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা অজানা আহমদ কামরান জানান, ঈদের দিন এক হাজার বায়ান্ন জন পর্যটক প্রবেশ করেছেন। টিকিট বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ২২০ টাকা, ঈদের পরদিন ১ হাজার আটশ বত্রিশ জন প্রবেশ করেন। টিকিট বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ছয়শ ষাষট্টি টাকা। ঈদের তৃতীয় দিন আজ সোমবার (২৩ মার্চ) পর্যটক প্রবেশ করেছেন এক হাজার আটশ চল্লিশ জন। টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে দুই লাখ চার হাজার ছয়শ বারো টাকা। তিন জন বিদেশী পর্যটকসহ সর্বর্মোট ৪ হাজার ৭২৪জন পর্যটক থেকে আয় হয়েছে৫ লাখ ২৮ গাজার ৫০৯ টাকা টাকা।
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ওসি মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ঈদে পর্যটকদের নিরাপত্তায় সকল পর্যটন স্পটে টুরিস্ট পুলিশের টহল জোরদার রয়েছে। সব সংস্থার সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এখন পর্যন্তক কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আশা করছি আগত পর্যটকরা নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণভাবে ঈদের ছুটিতে আনন্দ উপভোগ করতে পারবেন।
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, এবার ঈদের ছুটিতে বিভিন্ন পর্যটন স্পট, হোটেল-রিসোর্টসহ জেলাজুড়েই দর্শনার্থীদের পদচারণা ছিল। এখন পর্যন্ত জেলার কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পর্যটকদের নিরাপত্তাসহ সকল সুবিধা নিশ্চিতে জেলা পুলিশ প্রশাসন তৎপর রয়েছে।
১৯ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৫৪ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৩১ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে
৫ ঘন্টা ৫৯ মিনিট আগে
৭ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে