খালেদা জিয়ার চিরবিদায় - নিভে গেল রাজনীতির দীপশিখা
জাহেদ কায়সার :
নিভে গেল বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীপশিখা। 'মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী' হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ে আমৃত্যু আপোষহীন নেত্রী,
প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশের অন্যতম 'প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
নেতৃত্ব, আন্দোলন, কারাবাস ও রাষ্ট্রক্ষমতার অভিজ্ঞতা-সব মিলিয়ে বেগম খালেদা জিয়া
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক। তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ৫৬ হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন-সার্বভৌম মাতৃভূমি বাংলাদেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষের রাজনৈতিক বাতিঘর ছিলেন। দমন-পীড়ন, মামলা ও বন্দিত্বের মধ্যেও কখনো আপস না করে তিনি বিরোধী রাজনীতির ইতিহাসে এক দৃঢ় ও অনমনীয় নেতৃত্বের অনন্য উদাহরণ হয়ে আছেন।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী এক মহীয়সী নারী, যিনি নিখাদ এক গৃহবধূ থেকে হয়ে উঠলেন সফল রাষ্ট্রনায়ক।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শহিদ জিয়াউর রহমান ১৯৬১ সালে যখন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তখন বেগম খালেদা জিয়ার বয়স ছিল ৩৬ বছর। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়ে জাতির ধ্রুবতারায় পরিণত হয়েছিলেন। অন্ধকারে যেমন দিকহারা মানুষ ধ্রুবতারার অবস্থান দেখে দিশা খুঁজে পায়, তেমনি খালেদা জিয়ার চিন্তাধারা দেখেও জাতি দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সঠিক পথের নিশানা খুঁজে পেত। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিজেকে দেশপ্রেম, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রমাণ করে গেছেন।
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন, যিনি ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান।বেগম জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে বিভক্তির পর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে চলে আসেন। তাঁর আদি বাড়ি মূলত দেশের দক্ষিণ-পূর্ব জেলা ফেনীতে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন।
জিয়াউর রহমান বীর উত্তম যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন, তখন বেগম জিয়া ফার্স্ট লেডি হিসেবে তার সঙ্গী হিসেবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এবং নেদারল্যান্ডের রানি জুলিয়ানার সাথে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
১৯৮১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর, তিনি ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারী সাধারণ সদস্য হিসাবে বিএনপিতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বেই ছিলেন।
৪৩ বছরে রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়াকে জেলে যেতে হয়েছে অন্তত ৫ বার।
মূলত খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের ওপর বড় ঝড় আসে ২০০৭ সালের এক-এগারোর পর। সে সময় সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে। খালেদা জিয়া, তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় বিএনপিকে ভাঙার, খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার নানা চেষ্টা করা হয়।
স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলন খালেদা জিয়ার একটি শক্ত ভিত্তি ও ব্যক্তিত্ব গড়ে দেয়
এমন একটি পটভূমিতে ২০০৭ সালে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কানাঘুষা শোনা যাচ্ছিল যে খালেদা জিয়া দেশত্যাগ করবেন, সৌদি আরবে যাবেন। এর আগে ৮ মার্চ তারেক রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি মুষড়ে পড়েন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনেকে গা ঢাকা দেন। ২২ এপ্রিল রাতে বিএনপির তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার আ স ম হান্নান শাহ সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানিয়ে দেন যে খালেদা জিয়া সৌদি আরবে যাবে না। তিনি যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে প্রস্তুত, তবু দেশ ছাড়বেন না।
পরে খালেদা জিয়া নিজেই বলেন, ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নাই, এটাই (বাংলাদেশ) আমার ঠিকানা। এই দেশ, এই দেশের মাটি-মানুষই আমার সবকিছু। কাজেই আমি দেশের বাইরে যাব না।’
সেনা–সমর্থিত এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ একটি দুর্নীতির মামলায় তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন আরাফাত রহমান কোকো। একই দিন গ্রেপ্তার করা হয় খালেদা জিয়াকে। পরে তারেক রহমানকে লন্ডনে আর আরাফাত রহমানকে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়। কারাগারে থাকাকালে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি রাজি হননি।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ৭–দলীয় ঐক্যজোটের নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া অনবদ্য ভূমিকা পালন করেন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর ২০১৫ সালে আবার আন্দোলন দানা বাঁধলে খালেদা জিয়াকে গুলশানের কার্যালয়ের সামনের সড়কে ১৪টি ট্রাক ও ভ্যান দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল।
এই ঘটনাগুলো খালেদা জিয়ার জীবনে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। এর মধ্যে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান মারা যান। তখন খালেদা জিয়া তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ।
২০১৫ সালে খালেদা জিয়াকে গুলশানের বাসায় অবরুদ্ধ রাখা হয়তবু চরম সংকটের সময়েও খালেদা জিয়া আস্থা রেখেছিলেন দেশবাসীর ওপর। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি অন্তত ৫ বার কারাবরণ করেন। সর্বশেষ ৬ আগস্ট ২০২৫ সালে পুরোপুরি মুক্তি পান।
তিনি ছিলেন আধিপাত্যবাদের বিরুদ্ধে সদা জাগ্রত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন, নিখাদ দেশপ্রেম, সংযতবাক, রুচিশীল পোশাক এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার ক্ষেত্রে পরিমিত ভাষা ব্যাবহারের কুশলতা এবং দেশের ক্রান্তি লগ্নে নেতৃত্বের দৃঢ়তা কারণে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশ ও বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাস চিরকাল মনে রাখবে।
৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে দেশবাসী আজ অত্যন্ত শোক, দুঃখ ও বেদনাহত। এমন এক অস্থির সময়ে তিনি দুনিয়ার সফর শেষ করলেন যখন সমগ্র জাতিকে বিপদে সাহস জোগানো আর দুঃখে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য তার মতো এক অভিভাবকের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল অত্যন্ত বেশি। ফলে তার চিরবিদায়ে পুরো দেশ ও জাতি অভিভাবকহীন ও অসহায় হয়ে পড়ল।
লেখক : গণমাধ্যম কর্মী , সংগঠক।
১৩ ঘন্টা ৪৩ মিনিট আগে
১৩ ঘন্টা ৫৯ মিনিট আগে
১৫ ঘন্টা ১১ মিনিট আগে
১৬ ঘন্টা ২ মিনিট আগে
১৬ ঘন্টা ২৭ মিনিট আগে
১৬ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে
১৬ ঘন্টা ৫৪ মিনিট আগে