শরতের প্রকৃতি বাঙালির জন্য বিশেষ বার্তা নিয়ে আসে। আকাশজুড়ে সাদা মেঘ ভেসে চলে, কাশবনের দোলায় মন ভরে যায়, নদীর ঘাটে জমে শিশিরভেজা সকালের আলো। এই সময়েই মণ্ডপে মণ্ডপে, বাড়িতে বাড়িতে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে উদযাপন করা হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। পাঁচ দিন ধরে চলে আনন্দ, উৎসব আর মিলনমেলা। কিন্তু আনন্দের শেষ দিনটি—বিজয়া দশমী—হয়ে ওঠে সবচেয়ে আবেগঘন।দেবী দুর্গার বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। বিদায়ের মুহূর্তে যেন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়, অথচ মানুষের ভিড় আর ঢাকের তালে আবেগ জমে ওঠে। এর পরপরই যে প্রীতি সম্মেলন শুরু হয়, তা সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির বীজ বুনে দেয়। বিজয়ার আসল শিক্ষা এখানেই—অনিত্য জীবনে ঐক্যের স্থায়িত্ব।বিসর্জনের দিন গ্রামের চিত্র আলাদা আবহ তৈরি করে। প্রতিমা সাজানো হয়, শোভাযাত্রা বের হয়। ঢাকের বাজনা, উলুধ্বনি, শঙ্খধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখর হয়ে ওঠে। প্রতিমা যখন কাঁধে নিয়ে নদীর ধারে আনা হয়, তখন মানুষ ভিড় জমায়। কেউ চোখ মুছে, কেউ প্রার্থনা করে, কেউ আবার বারবার উচ্চারণ করে—“আসছে বছর আবার হবে।”শহরেও একই আবেগ। আলো-ঝলমলে শোভাযাত্রা, পথে পথে মানুষের দাঁড়িয়ে দেখা—সব মিলে বিজয়া যেন এক উৎসবের ভিড়ে বিদায়ের অশ্রু। প্রতিমা যখন জলে ভেসে যায়, তখন মনে হয়—এ বিদায় স্থায়ী নয়। আগামী বছরে আবার নতুন করে মিলন ঘটবে।এখানে নিহিত এক গভীর জীবনবোধ। সবকিছুই অনিত্য—আনন্দও, দুঃখও। বিদায় মানেই সমাপ্তি নয়; বরং প্রতিটি বিদায়ের ভেতরেই থাকে নতুন আশার প্রতিশ্রুতি।দেবী বিসর্জনের পরপরই শুরু হয় বিজয়ার প্রীতি সম্মেলন। বাড়ি বাড়ি মিষ্টি সাজানো হয়, অতিথিদের অভ্যর্থনা করা হয়। কোলাকুলি করে, “শুভ বিজয়া” বলে শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয়।গ্রামে যেমন কৃষক-মজুর, প্রতিবেশী সবাই মিলে মিষ্টি খায়, তেমনি শহরে দেখা যায় সহকর্মীরা অফিস শেষে একে অপরকে আমন্ত্রণ জানায়। মিষ্টির প্যাকেট ভাগাভাগি হয়, কোলাকুলি হয়। মুসলিম প্রতিবেশীরাও আসে, শুভেচ্ছা জানায়, মিষ্টি মুখ করে।এ যেন সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিজয়ার প্রীতি সম্মেলন প্রমাণ করে, ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করে না—মানুষে-মানুষে মিলনের উৎসবই আসল শক্তি।পূর্বে জমিদার বাড়ির দুর্গোৎসবের সঙ্গে প্রীতি সম্মেলনের ঐতিহ্য অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। বিসর্জনের পর ভোজনের আয়োজন করা হতো, যেখানে প্রজারা ও প্রতিবেশীরা অংশ নিতেন। পূর্বে বুদ্ধিজীবীরা বিজয়া উপলক্ষে প্রীতি সম্মেলনে মিলিত হয়ে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন।অতএব বিজয়া শুধু ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের দীর্ঘ ঐতিহ্যের বাহক।রবীন্দ্রনাথের কবিতায় যেমন বিদায়ের সুর ধরা পড়ে, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় পাওয়া যায় প্রকৃতির সঙ্গে বিজয়ার আবহ। নাটক ও চিত্রকলায় প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্য এক অনন্য চিত্র হয়ে এসেছে বারবার।সাহিত্য ও শিল্পে বিজয়ার এই উপস্থিতি দেখায়, উৎসবটি শুধু ধর্মীয় নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত।আজকের দিনে যখন সমাজে বিভাজন, হানাহানি, অসহিষ্ণুতা বেড়েছে, তখন বিজয়ার শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিসর্জন আমাদের শেখায়, কোনো কিছুই স্থায়ী নয়; সবকিছুই পরিবর্তনশীল। প্রীতি সম্মেলন শেখায়, সম্পর্কই আসল স্থায়িত্ব—ঐক্য ও সৌহার্দ্য ছাড়া সমাজ টিকে থাকতে পারে না।যদি আমরা এই শিক্ষা জীবনে ধারণ করি, তবে আমাদের সমাজ আরও মানবিক, আরও সহনশীল হয়ে উঠবে।বিজয়ার বিসর্জন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন ক্ষণস্থায়ী, আনন্দও ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু বিজয়ার প্রীতি সম্মেলন আমাদের শেখায়—ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বই স্থায়ী। বিদায়ের বেদনা যতই গভীর হোক না কেন, মিলনের কোলাকুলি সেই বেদনাকে প্রশমিত করে।তাই বিজয়া আমাদের উৎসবের আনন্দের বাইরেও এক অমূল্য শিক্ষা দেয়—অনিত্য জীবনে ঐক্যের স্থায়িত্বই মানবতার আসল শক্তি।(লেখকঃ সংবাদকর্মী ও কলামিষ্ট)
১ ঘন্টা ২১ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ১ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ২১ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ১০ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ১২ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ১২ মিনিট আগে