মৌলভীবাজারের বড়লেখার হাকালুকি হাওর এবং শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিলের যেখানে-সেখানে বর্জ্য ও প্লাস্টিক অবাধে ফেলে রাখায় পরিবেশ দূষণসহ জলরাশি মারাত্মক দূষিত হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই হাওরের মৎস্যসম্পদ ধ্বংসের শঙ্কা করা হচ্ছে।
জেলার বড়লেখায় অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওর ‘হাকালুকি’। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মিঠাপানির জলাধার ও মাছের অন্যতম বড় প্রজনন কেন্দ্রও এটি। এছাড়া জেলার শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহত্তম শস্য ও মৎস্য ভাণ্ডারখ্যাত বাইক্কা বিল-হাইল হাওর। কিন্তু সুস্বাদু মাছ উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত দুই হাওরেই মাছের উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিলগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বিলুপ্তির পথে দেশীয় প্রজাতির রাণী মাছ। হুমকিতে পরিবেশ-প্রতিবেশ।
স্থানীয়রা জানান হাওর, নদী ও খালে নানা অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্য বিনা বাধায় ফেলায় জেলার মনু, ধলাই, জুড়ী নদীসহ বিভিন্ন নদ-নদী, ছড়া, হাওর-বিলের জলরাশি মারাত্মক দূষিত হচ্ছে। এতে নদ-নদী ও খাল-বিলে মাছের বিচরণ ক্ষেত্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দিন দিন হাওরে স্বাদুপানির মাছের বংশবিস্তার কমে যাচ্ছে। উপরন্তু পানির নিচে উৎপাদিত বিভিন্ন উদ্ভিদের বংশবিস্তার কমে যাওয়ায় হাঁসসহ বিভিন্ন পশুপাখির প্রাকৃতিক খাদ্যের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
সম্প্রতি জেলার জুড়ী উপজেলায় দেখা গেছে, বাজারের বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট কোনো স্থান না থাকায় পাশের জুড়ী নদীতে অবাধে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। এসব বর্জ্য কোনো বাধা ছাড়াই গিয়ে পড়ছে হাকালুকি হাওরে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কোনো নির্ধারিত স্থান নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম না থাকায় যে-যার ইচ্ছামতো যত্রতত্র ফেলছে ময়লা। এতে পরিবেশ ও নদীর তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ রকম প্রায় ১০টি নদী এবং অসংখ্য পাহাড়ি ছড়ার এই হাওরের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। সেসব দিয়েও আসছে বালু। এতে অধিকাংশ বিলই ইতোমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি করে হাওর দখলে নেওয়ারও। এসব কারণে হাওর হারাচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। ফলে কাঙ্খিত মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে হুমকিতে পরিবেশ-প্রতিবেশ। এছাড়া জেলার বিশাল এই মৎস্য ভাণ্ডারে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়াকেও আশঙ্কাজনক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা।
জেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্র জানায়, হাকালুকি হাওর এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। এর আয়তন প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে শুধু বিলের আয়তন ৪ হাজার ৪০০ হেক্টর। হাওরটি মৌলভীবাজারের বড়লেখা, কুলাউড়া, জুড়ী; সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ এবং বিয়ানীবাজার উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত। জুড়ী, ফানাই, সুনাইসহ ১০টি নদ-নদী এবং অসংখ্য পাহাড়ি ছড়ার হাওরের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। সুনাই, পানাই ও জুড়ী নদী এই বিশাল হাওরের মূল প্রবাহ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পলি জমে অনেক বিল ভরাট হয়ে গেছে। কাগজে-কলমে ২৩৮টি বিল থাকলেও প্রায় অর্ধেকের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেগুলো অবশিষ্ট আছে, তাও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বছর কয়েক আগে যেসব বিলের নাব্যতা ২০-২৫ ফুট গভীর ছিল, এখন সেগুলো কমে ৮-১০ ফুটে চলে এসেছে। এ ছাড়া হাওরের আয়তন ১৮ হাজার হেক্টর কাগজে কলমেই।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফ হোসেন জানান, ২৩৮টি বিল আছে হাকালুকি হাওরে। এসব বিলের ৬০ শতাংশ ইজারা দেওয়া হলেও বাকিগুলো ভরাট হওয়ার কারণে ইজারা দেওয়া যাচ্ছে না। একসময় হাওরে দেশীয় ২৬০ প্রজাতির মাছ ছিল, ২০১৫ সালের একটি জরিপে ১৪৩ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া গেছে।
সরেজমিন হাওর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হাওরের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। এসব বর্জ্যে একদিকে দূষিত হচ্ছে হাওরের পানি; অন্যদিকে ভরাট হচ্ছে হাওর। হাওর ভরাটের প্রভাবেই জেলায় অল্প বৃষ্টিতেও বন্যা সৃষ্টি হচ্ছে। গত বছর বন্যায় কয়েক মাস কুলাউড়া, বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে হাওর পাড়ের লাখো মানুষ পানিবন্দী ছিলেন। গত দশ বছরের তুলনায় বর্তমানে হাওরে পানি ও মাছ চারগুণ কমেছে। ফলে হাওর হারাচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য।
হাওর পাড়েরর বাসিন্দরা বলেন, হাওরে আগের মতো মাছ মেলে না। পানির নিচে হাত দিলেই শুধু প্লাস্টিক হাতে আসে। আগে যে জায়গায় ১৫-২০ ফুট গভীর পানি ছিল, এখন সেই জায়গায় ৫-৭ ফুট। বালু এসে ধীরে ধীরে বিলগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। সরকারিভাবে হাওর সুরক্ষার দৃশ্যমান নেই কোনো উদ্যোগ।
স্থানীয় পরিবেশবিদরা বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির হাওর হাকালুকি বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। এর বিলগুলো জরুরিভাবে খনন করা প্রয়োজন। হাওরের জলজ উদ্ভিদগুলো রক্ষা করতে হবে। হাওরের প্রবেশ পথে ছড়া ও নদীগুলো খনন করতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সচেতনতার অভাব ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উদাসীনতায় প্রাতদিন এভাবে দূষণ বাড়ছে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ রক্ষায় আমাদের দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হেেছ। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে এসব বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি কার্যকরী উদ্যোগ তাদের রয়েছে বলেও তিনি জানান।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন বলেন, হাওর সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে হাওরে বর্জ্য পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্জ্য ও বালু দ্বারা হাওর ভরাট বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
৪৫ দিন ২৩ ঘন্টা ৩০ মিনিট আগে
৫৮ দিন ২৩ ঘন্টা ২৮ মিনিট আগে
৫৯ দিন ২১ ঘন্টা ৪ মিনিট আগে
৬২ দিন ২২ ঘন্টা ৩৬ মিনিট আগে
৭৫ দিন ২৩ ঘন্টা ৫৮ মিনিট আগে