তানজিলার মা’ সংগ্রামের নাম, মায়ের আরেক নাম
শুধুমাত্র মায়েরাই বোধহয় সন্তানের জন্য জীবনের সবটুকু উজাড় করে দিতে পারেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজেকে নিঃস্ব করতেও যাঁরা দ্বিধা করেন না, তাঁদের মধ্যেই একজন হলেন চৌগাছার ‘তানজিলার মা’। নিঃশব্দ সংগ্রামের এই নারী আজ সমাজের সামনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
তানজিলার বাবা মারা যান ২০০২ সালে। তখন তানজিলা ছিল খুবই ছোট, সঙ্গে ছিল তার আরও একটি ছোট ভাই। স্বামীহারা এই নারী এক মুহূর্তের জন্যও ভেঙে পড়েননি। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে শুরু করেন কঠিন জীবনযুদ্ধ। নিজের দুঃখ-কষ্টের কথা ভুলে গিয়ে একটাই লক্ষ্য স্থির করেন—যে করেই হোক, ছেলে-মেয়েকে শিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন।
চৌগাছা উপজেলার অনেকেই তাঁকে চেনেন। নিয়মিত উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে বেড়ানো ছিল তাঁর নিত্যদিনের বাস্তবতা। কখনও ভাতা, কখনও প্রশিক্ষণ—যা পেয়েছেন, তাই দিয়েই সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানোর চেষ্টা করেছেন। তবে এসব সুযোগ ছিল অল্প ও অনিয়মিত। তারপরও তিনি হাল ছাড়েননি।
এক সময় চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তানজিলার মাকে নিয়মিত দেখা যেত। প্রায়ই এসে বিনীত কণ্ঠে বলতেন, “মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছি না, যদি একটু সহযোগিতা করেন।” সামর্থ্যের মধ্যে থেকে তখন সহযোগিতার চেষ্টা করা হয়েছে বলেই জানা যায়।
পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিএম) হিসেবে যশোরে যোগদানের পরও তিনি হাল ছাড়েননি। যশোরে গিয়ে সরাসরি দেখা করে জানান, নানা জনের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে তিনি মেয়েকে অনার্স পর্যন্ত পড়িয়েছেন। বর্তমানে তানজিলা যশোরের এম এম কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। আর তার ছোট ভাই চৌগাছার একটি কলেজে পড়াশোনা করছে।
এই দীর্ঘ পথচলায় তানজিলার মা কতটা কষ্ট করেছেন, কতটা অপমান, অবহেলা আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে—তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কেমন মানুষ, তা অনেকেরই জানা নেই। কিন্তু মা হিসেবে তিনি নিঃসন্দেহে অনন্য, অসাধারণ।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—অসংখ্য ত্যাগ আর সংগ্রামের পর মেয়েকে মাস্টার্সে ভর্তি করাতে পারলেও এখন তাঁর আর সামর্থ্য নেই প্রয়োজনীয় বই কিংবা চাকরির প্রস্তুতির বই কেনার। জীবনের শেষ শক্তিটুকু দিয়েও তিনি আজ অসহায়।
এই প্রতিবেদনটির মাধ্যমে সমাজের সচেতন ও হৃদয়বান মানুষের কাছে একটি মানবিক আহ্বান—যদি কেউ এগিয়ে এসে তানজিলার পড়াশোনার বই কিংবা চাকরির প্রস্তুতির জন্য সামান্য সহযোগিতা করেন, তবে হয়তো এই মায়ের দীর্ঘ লড়াই কিছুটা হলেও সফলতার আলো দেখবে।
‘তানজিলার মা’ কেবল একজন ব্যক্তি নন—তিনি আমাদের সমাজের হাজারো সংগ্রামী মায়ের প্রতিচ্ছবি। তাঁর গল্প আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, মনে করিয়ে দেয়—একজন মায়ের ত্যাগ কতটা নিঃস্বার্থ আর সীমাহীন হতে পারে।