শ্রীমঙ্গলে বিএনপির দুর্দিনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর পাশে দাঁড়ালেন বিএনপি নেতা তাজ উদ্দিন তাজু লোহাগড়ায় করফা মধুমতি যুবসংঘের ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন দিঘলিয়া ইউনিয়ন একাদশ ক্ষেতলালে ইসলামী পাঠাগারের যাত্রা শুরু লালপুরে খালে মাছ ধরতে গিয়ে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু লালপুরে পারিবারিক কলহের জেরে যুবকের আত্মহত্যা জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পূর্তি উলপক্ষে ঈশ্বরগঞ্জে বিএনপির আনন্দ মিছিল লাখাইয়ে পুলিশের অভিযানে ৫৩৩পিচ ইয়াবা এবং নগদ অর্থ সহ গ্রেপ্তার- ০২। বর্তমান সরকার শিক্ষার উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে : বানিয়াচংয়ে হুইপ জি কে গউছ ‎ ‎রামপালে সংসার চালাতে মাথার চুল বিক্রি করলেন রেহেনা বেগম লালপুরে স্বামী-স্ত্রীসহ ৩ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার, আড়াই কেজি গাঁজা উদ্ধার তা’মীরুল মিল্লাতে ফকীহ ইব্রাহিম খলিলের ‘নাসিহা’ কিতাবের মোড়ক উন্মোচন নোয়াখালীতে বিএনপি নেতাকে লক্ষ্য করে গুলি, গুলিবিদ্ধ ২: পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ, গোয়ালন্দে যুবলীগ নেতা খুন; দুই ঘণ্টায় গ্রেপ্তার অভিযুক্ত সরকারের নির্দেশনায় সমৃদ্ধভাবে আমরা বাংলাদেশ গড়তে চাই,পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী, ফরহাদ হোসেন আজাদ শেরপুরের ঝিনাইগাতী থানা পুলিশের অভিযানে ৬০০ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আহ্বানে লোহাগাড়ায় পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যুবদল নেতা জসিম উদ্দিন পীরগাছায় খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে চুরির অভিযোগ, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট কৃষকের অভিযোগে হাটে আইনমন্ত্রী, নিজেই দাঁড়িয়ে দেখলেন পাটের ওজন সেবার মানসিকতা না থাকলে চিকিৎসার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়: প্রধানমন্ত্রী আমিরাতে ঈদে মিলাদুন্নবী ও জাতীয় দিবসের ছুটি ঘোষণা

ভাইফোঁটা: মৃত্যু নয়, জীবনের আশীর্বাদ

বৃহস্পতিবার সনাতন ধর্মালম্বীদের ভাই ফোটা।মানুষের জীবনে সম্পর্কের বন্ধনই আসল শক্তি। সেই সম্পর্কেরই এক অনন্য প্রকাশ ঘটে ভাইফোঁটার উৎসবে। বাঙালির ঘরে ঘরে একদিন, যখন বোন ভাইয়ের কপালে চন্দনের ফোঁটা এঁকে দেয়— সেই মুহূর্তে যেন জন্ম নেয় জীবনের প্রতি এক নতুন আশীর্বাদ, মৃত্যুর ওপরে জীবনের জয়গান। ‘মৃত্যু নয়, ভাইয়ের দীর্ঘজীবনের কামনা’— এই কথাটিই হয়ে ওঠে এই উৎসবের প্রাণস্পন্দন।সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে ভাইফোঁটা বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া এক গভীর পারিবারিক উৎসব। এটি পালিত হয় কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে, অর্থাৎ দীপাবলির পরপরই। এই দিনে বোনেরা তাদের ভাইদের কপালে চন্দনের ফোঁটা এঁকে বলে ওঠেন—“যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা।”এই ফোঁটায় থাকে ভাইয়ের সুস্থতা, দীর্ঘায়ু ও মঙ্গলকামনার বার্তা। ফোঁটা পরানোর সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে বাজে শঙ্খ, শোনা যায় উলুধ্বনি, আর মিষ্টির গন্ধে ভরে ওঠে আকাশ-বাতাস। ছোট বড় সবাই মিলে আনন্দে মেতে ওঠে— ঘরোয়া হলেও এই উৎসবের সামাজিক ও আবেগিক দিক অত্যন্ত গভীর।ভাইফোঁটার ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে পৌরাণিক কাহিনি আমাদের নিয়ে যায় বহু প্রাচীন কালে— যম ও যমুনার গল্পে। পুরাণ মতে, মৃত্যুর দেবতা যম তাঁর বোন যমুনার ভালোবাসার টানে একদিন তার বাড়িতে যান। যমুনা তখন ভাইয়ের কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে তাঁর দীর্ঘজীবন কামনা করেন। সেই থেকেই শুরু হয় ভাইফোঁটার প্রথা।অন্য একটি মতে, নরকাসুর বধের পর শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বোন সুভদ্রার কাছে গেলে সুভদ্রা তাঁর কপালে ফোঁটা দিয়ে মিষ্টি খেতে দেন— সেখান থেকেও এই রীতির প্রচলন বলে মনে করা হয়।এই দুটি গল্পই এক অমোঘ সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে— মৃত্যুর দেবতাকেও বোনের স্নেহ জয় করতে পারে। মৃত্যু নয়, জীবনের চেতনা এখানে বড় হয়ে ওঠে।শুধু পুরাণেই নয়, ইতিহাসের পৃষ্ঠায়ও এই উৎসবের ইঙ্গিত মেলে। চতুর্দশ শতকের ‘দীপোৎসবকল্প’ নামের এক তালপাতার পুঁথিতে আচার্য সর্বানন্দ সুরী লিখেছিলেন মহাবীর বর্ধমানের পর তাঁর অনুগত রাজা নন্দীবর্ধনের কাহিনি। মহাবীরের প্রয়াণে শোকাহত রাজা অনশন ধরেছিলেন। তখন তাঁর বোন অনসূয়া তাঁকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কপালে রাজতিলক দিয়ে খাবার খাইয়ে বলেছিলেন, “রাজ্যের প্রজারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, তুমি জেগে ওঠো, ভাই।”এই ঘটনাটিও ঘটেছিল কার্তিক মাসের শুক্ল দ্বিতীয়া তিথিতে। অর্থাৎ আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে থেকেই এই উৎসবের প্রথা বিদ্যমান ছিল।যমকে ঘিরে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য রয়েছে। তিনি সূর্যপুত্র বৈবস্বত, মৃত্যুর দেবতা, অথচ একই সঙ্গে মানবীয় অনুভূতিরও প্রতীক। ঋগ্বেদে যমকে বলা হয়েছে প্রথম মৃত মানুষ— অর্থাৎ যিনি মৃত্যুকে জানলেন, তাই তিনিই মৃত্যুর অধিপতি হলেন। তাঁর বোন যমুনা— জল, প্রেম, প্রবাহ, পুনর্জন্মের প্রতীক।মৃত্যু ও প্রেম— এই দুই বিপরীত সত্তা মিলেমিশে এক হয়ে যায় ভাইফোঁটার আচার-আচরণে। মৃত্যু যেন ভালোবাসার মধ্যে বিলীন হয়, ভয় পায় স্নেহের ছোঁয়ায়। তাই তো বোনের হাতের ফোঁটা হয়ে ওঠে মৃত্যুর ওপরে জীবনের জয়গাথা।আধুনিক সমাজে ভাইফোঁটা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এক সম্পর্কের পুনর্নবীকরণ। এই দিনে ভাই ও বোন একে অপরের প্রতি দায়িত্ব, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতিশ্রুতি নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।ভাইয়ের জীবনের সুরক্ষায় বোনের প্রার্থনা, আর বোনের সুখের জন্য ভাইয়ের প্রতিশ্রুতি— এই দুয়ের মিলনে গড়ে ওঠে মানবিকতার বন্ধন।যেখানে সম্পর্কের টানাপোড়েনে ভরা আজকের সমাজ, সেখানে ভাইফোঁটার মতো উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়— পারিবারিক ভালোবাসা এখনও মানবজীবনের মূল ভিত্তি।ভাইফোঁটার সকালে বোনেরা উপবাস থেকে স্নান সেরে শঙ্খধ্বনি দিয়ে পূজা শুরু করে। চন্দনের ফোঁটা, ধান, দুর্বা ঘাস, প্রদীপ, মিষ্টি ও ফুল দিয়ে সাজানো থালা থাকে হাতে। ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিয়ে বলা হয়—“চিরজীবী হও ভাই, যমের রাজ্যে যেও না তুমি,শত জন্মে আমার ভাই হয়ে ফিরে এসো তুমি।”এমন শুভকামনায় বোনের চোখ ভিজে ওঠে। ভাইও বোনকে উপহার দেয়— কাপড়, অলংকার, মিষ্টি কিংবা ভালোবাসার প্রতীক কিছু।এই উৎসবে নারীর অবস্থানটি গভীরতর। বোন এখানে শুধু ভালোবাসার প্রতীক নন, বরং জীবনদাত্রী শক্তির প্রতিরূপ। মৃত্যুর দেবতার কপালে যিনি ফোঁটা দেন, তিনি আসলে জীবনের জয় ঘোষণা করেন। সেই নারী— মা, বোন, প্রেমিকা— যিনি মৃত্যুকেও পরাজিত করতে পারেন স্নেহের শক্তিতে।বৈদিক যুগের যম-যমী কিংবা পুরাণের যম-যমুনা— দু’জনেই একসময় জটিল প্রতীক ছিলেন। তাদের সম্পর্ক ছিল মৃত্যু ও প্রেমের রূপক। কিন্তু সমাজ সেই জটিলতাকে ঘরোয়া রূপে রূপান্তরিত করেছে।বোনের হাতের ফোঁটা সেই জটিল পুরাণকেও সহজ, মানবিক, পারিবারিক রূপ দিয়েছে। এতে মৃত্যু মুছে গেছে, থেকে গেছে ভালোবাসার প্রতীক।এভাবেই এক পৌরাণিক আখ্যান সমাজে মানবিকতায় রূপান্তরিত হয়েছে— এটাই ভাইফোঁটার সবচেয়ে বড় সাফল্য।আজকের নগরজীবনে উৎসবের চেহারা পাল্টেছে। অনেক ভাই-বোন দূরে থাকে, কেউ বিদেশে, কেউ কর্মব্যস্ততায়। তবু ভিডিও কলের পর্দায়, কিংবা ডাকযোগে পাঠানো শুভেচ্ছায় সেই সম্পর্ক এখনও বেঁচে থাকে।কেউ হয়তো মিষ্টির বাক্স পাঠায়, কেউ শুধু একটা বার্তা— “ভালো থেকো ভাই।” এই ছোট্ট বার্তাটিও যেন হয়ে ওঠে সেই চিরন্তন ফোঁটার প্রতীক।ভাইফোঁটার গভীরে আছে এক দার্শনিক বার্তা— জীবন মৃত্যুর চেয়ে বড়। মৃত্যুর দেবতাকেও বোনের ভালোবাসা জয় করতে পারে। এই উৎসব তাই কেবল ধর্মীয় নয়, এক গভীর মানবিক বার্তাবাহী উৎসব।এ যেন প্রতিবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়— জীবনের প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি ভালোবাসা, প্রতিটি শুভকামনাই মৃত্যুর বিরুদ্ধে এক অবিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ।ভাইফোঁটা আমাদের শেখায়— ভালোবাসা মানেই বেঁচে থাকা, যতদিন জীবনের আলো জ্বলে। যমের কপালে যমুনার ফোঁটা, কিংবা আজকের কোনো বোনের ভাইয়ের কপালে চন্দনের বিন্দু— সবই একই প্রতীক: মৃত্যুর ওপর জীবনের জয়, অন্ধকারের ওপরে আলোর জয়।যে পৃথিবী প্রতিদিন মৃত্যুভয়ে, বিভাজনে, অবিশ্বাসে ভরে উঠছে— সেখানে ভাইফোঁটা আমাদের শেখায়, স্নেহই আসল আশ্রয়, ভালোবাসাই চিরজীবনের প্রতিশ্রুতি।(লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিষ্ট)

Tag
আরও খবর