/ উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ইতিবাচক

দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পথ দেখাবে টকিং গ্লাস

সায়েম আহমাদ - রিপোর্টার

আপডেট: 11-04-2021 15:19:52

দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের  পথ দেখাবে টকিং গ্লাস”

প্রতিটি সমাজে পিছনে পড়া জনসমষ্টির মধ্যে শারীরিকভাবে অক্ষম অর্থাৎ প্রতিবন্ধী নামক একটি দল আছে। আমাদের দেশে প্রায় ১কোটি মানুষ শারীরিকভাবে অক্ষম। বিশাল এই জনসমষ্টির যদি ৫০ভাগও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারতো তাহলে বাংলাদেশের জিডিপির ব্যাপক পরিবর্তন হতো। এই পিছিয়ে পড়া জনসমষ্টিকে সামনে এগিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের  কাছে একটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলো যে কিভাবে শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা সাধারণ জনগণের মতো কাজ করানো যেতে পারে। সেই প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালেরই সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী সেমিনারের আয়োজন করা হয়। উক্ত সেমিনারে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স এবং ইন্জিনিয়ারিং বিভাগের দুইজন শিক্ষার্থী (সোহেল মাহমুদ ও রিপন চন্দ্র দাস) অংশগ্রহণ করেন। এবং সেমিনারটিতে বেশ কিছু আইডিয়া ডেভেলপ হয় যাতে করে  শারীরিকভাবে অক্ষম লোকদেরকে সমাজের সামনের কাতারে কিভাবে এগিয়ে আনা যায়।


এটার উপর ভিত্তি করে ৩টি ক্যাটাগরিতে (দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, বাক প্রতিবন্ধী ও বিকলাঙ্গ মানুষ) অসংখ্য আইডিয়া সাবমিট করা হয়েছিল। তিন ক্যাটাগরির মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ক্যাটাগরিতে তাদের আইডিয়া সাবমিট করেন। এবং ঐ ক্যাটাগরিতে ৩১১ টি আইডিয়া জমা হয়। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই করে ৬টি আইডিয়া তারা সিলেক্ট করেন। এরপর যথাক্রমে ৬টি থেকে ৩টি আইডিয়া বাদ দিয়ে বাকি ৩টা তারা তাদের তালিকায় রাখেন। অবশেষে তারা ১টি আইডিয়াকে গ্রহণ করেন এবং সেই আইডিয়াটি ছিলো বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আইডিয়া। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের  আইডিয়া ভেলিড কিনা সেটা পরিক্ষা-নিরিক্ষা করে চুড়ান্তভাবে তারা সিলেক্ট করেন এবং আইডিয়াটি গ্রহণ করে সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। ২০১৮ সালের ৩০শে জুন ২০লাখ টাকা অনুদানের পাস হয় তাদের প্রজেক্টের জন্য এবং পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের তদারকির মাধ্যমে প্রোজেক্টের কাজ শেষ করার জন্য নির্দেশনা আছে। এরপর ২০১৮ সালের আগষ্ট বা সেপ্টেম্বরের মধ্যে অনুদানের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে চলে আসে।


যাইহোক, এই টকিং গ্লাস বা কথা বলার গ্লাসটির আইডিয়া টি নিয়ে সর্বপ্রথম কম্পিউটার সাইন্স এবং ইন্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থী সোহেল মাহমুদ  গবেষণা করেন। পরবর্তীতে তার বন্ধু রিপন চন্দ্র দাস ও তার বিভাগের জুনিয়র বিপুল মন্ডল এই গবেষণার সাথে যুক্ত হন। প্রথমে তারা তাদের কাজটি একটি মাইক্রো সিস্টেমের মাধ্যমে করার চেষ্টা করলেও সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। এরপর কাজটি অ্যাপের মাধ্যমে করার চেষ্টা করলেও সেখানে নানা জটিলতা দেখা দেয়। যেমনঃ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী একজন মানুষকে অ্যাপ ব্যবহার করতে গেলে অন্য একজন সাধারণ মানুষের সাহায্য লাগবে। এতে করে আবার সেই নির্ভরশীলতার জটিলতা সৃষ্টি হবে। অনেক ভাবনা চিন্তার পর তারা তাদের প্রাথমিক চিন্তায় ফিরে যান। এরকম কয়েকবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করায় তাদের প্রায় বছরখানেক সময় চলে যায়।


২০২০ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে তারা এটা নিয়ে আবারও গবেষণা শুরু করেন। তখন গবেষণার ম্যাকানিজম গুলো সব ঠিকঠাক থাকলেও আউটপুট সন্তোষজনক হচ্ছিলো না। এরপর মার্চের দিকে কাজটার অনেকাংশ শেষ হয়ে গেলেও তারা সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারে না। কারণ মার্চের ১৮তারিখ থেকে বাংলাদেশে সরকার করোনা মহামারীর কারণে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। এভাবেই তাদের কাজের গতি মুহুর্তেই থমকে যায় এবং তারা বাড়িতে চলে যান। সেপ্টেম্বরের দিকে লকডাউন সিঁথিল হলে এবং করোনার প্রকোপ কিছুটা কমে গেলে তারা আবার বরিশালে ফিরে এসে এটা নিয়ে প্রচুর গবেষণা করে অবশেষে ২০২১ সালের ২০মার্চে অফিসিয়ালি এই টকিং গ্লাসের কথা সবার সামনে প্রকাশ করেন। তাদের এই সম্পূর্ণ কাজের অর্থায়নের মনিটরিংয়ে ও সুপারভাইজার হিসাবে ছিলেন কম্পিউটার সাইন্স এবং ইন্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাহাত হোসাইন ফইসাল স্যার এবং কো-সুপারভাইজার হিসাবে ছিলেন ঐ একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান স্যার।


তাদের এই টকিং গ্লাস মূলত ৬ ভাবে একজন অন্ধ মানুষকে সাহায্য করবে। অর্থাৎ গ্লাসটিতে ৬টি সেন্সর যুক্ত করা হয়েছে। যথাঃ (১) অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশনঃ সাধারণত অন্ধ মানুষের ব্রেইলের সাহায্যে পড়াশোনা করে। এই গ্লাস ব্যবহারে করলে একজন অন্ধ মানুষ খুব সহজেই ব্রেইল ছাড়া পড়তে পারবে। সাধারণ জনগণ যেভাবে একটি বই, পিডিএফ বা ডকুমেন্ট পড়ে তারাও সেভাবে পড়তে পারবে। যেমনঃ কোনো বই বা পিডিএফ পড়তে চাইলে ভয়েস কমেন্টের মাধ্যমে যদি বলা হয় বই বা পিডিএফ এর ছবি উঠাও তাহলে গ্লাস টি তার সেন্সরের মাধ্যমে ক্যামেরা অন করে ছবি তুলে সাধারণ মানুষ যেভাবে পড়ে সেভাবে পড়া শুরু করবে এতে করে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী একজন মানুষ সহজেই পড়াগুলো শুনতে পারবে এবং আয়ত্ত্ব করতে পারবে। (২) ফেইস রিকগনিশনঃ এই পদ্ধতির মাধ্যমে সহজে ফেইস রিকগনিশন করে তার পরিচয় বলে দিতে পারবে। যেমনঃ একজন ব্যক্তি প্রথমবার টকিং গ্লাস পরিহিত ব্যক্তির সামনে আসলে গ্লাসটি বলবে একজন অপরিচিত ব্যক্তি এসেছে। এরপর তার পরিচয় দিলে তার ফিচার গ্লাসটি সেইভ করে রাখবে। এবং মজার বিষয় হলো, এরপর যতবারই সে ঐ গ্লাস পরিহিত ব্যক্তির সামনে যাবে ততবারই গ্লাসটি তার পরিচয় বলে দিতে পারবে।


এই সেন্সরটি সেট করার কারণ হলো অন্ধব্যক্তিরা অনেক সময় হীনমন্যতায় ভোগে তার সামনে কে এসেছে। এজন্য পরিচয় জানা থাকলে তারা একটা কনফিডেন্ট ফিল করতে পারবে। এছাড়াও বাবা, মা এবং পরিবারের বাকি সদস্যেরা বারবার তাদের সামনে আসলে তারকে বার বার জিজ্ঞাসা করতে হবে না তাদের সামনে কে এসেছে। (৩) অবজেক্ট ডিটেকশনঃ আমাদের চারপাশে যেসব অবজেক্ট গুলো থাকে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে যে যে অবজেক্ট গুলে দরকার হয় সেগুলো গ্লাসের সামনে থাকলে সহজেই গ্লাস টি তার সেন্সরের সাহায্যে ছবি তুলে ভয়েস কমেন্টের মাধ্যমে অবজেক্টগুলোর নাম বলে দিতে পারবে। যেমনঃ পড়ার টেবিলে বই, খাতা, কলম, ব্যাগ ইত্যাদি থাকে। টেবিলের সামনে যেয়ে গ্লাসকে কমান্ড করলে গ্লাসটি সহজেই অবজেক্ট গুলোর নাম বলে দিবে। (৪) কারেন্সি ডিটেকশনঃ এই সেন্সরের মাধ্যমে টাকার বান্ডিল টি গ্লাসের সামনে ধরলে সহজেই বলে দিতে পারবে কোনটা কত টাকার নোট। এক্ষেত্রে বাজার করা সহ সবক্ষেত্রেই তাদের লেনদেন করতে সুবিধা হবে। (৫) ডিরেকশন ডিটেকশন ও লোকেশন আইডেন্টিফিকেশনঃ কোন স্থানে তারা অবস্থান করছে ও দিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সাহায্য করবে এই সিস্টেমটি। যেমনঃ একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নামাজ পড়বেন সেক্ষেত্রে গ্লাসটি বলে দিবে পশ্চিম কোন দিকে। (৬) ও অ্যাবস্ট্র্যাকেল ডিটেকটিংঃ এই সিস্টেমের মাধ্যমে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ সহজেই বুঝতে পারবে তার সামনে কোনো বাঁধা আছে কিনা। যেমনঃ সামনে কোনো বাঁধা জাতীয় অবজেক্ট থাকলে গ্লাস টি সংকেত দিবে। যন্ত্রটি সেন্সরের মাধ্যমে দেখবে ২-৩ মিটারের মধ্যে কোনো বাঁধা আছে কিনা থাকলে তখন ক্যামেরা অন করে ছবি তুলে প্রোসেসিং করে বলে দিবে সামনে কোন রকমের বাঁধা আছে। সামনে যদি কোনো গাড়ি ধরুন রিকশা বা মোটরসাইকেল থাকে তাহলে নাম সহ বলে দিবে।


তাদের এই টকিং গ্লাসে আবিষ্কারের উদ্দেশ্য হলো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের স্বয়ংক্রিয় করে তোলা। এবং গ্লাস টি ইউজার লেভেলে আনতে গেলে তাদেরকে আরোও গবেষণা করতে হবে এটা নিয়ে। এবং তারা ইতিমধ্যে  এটির ফারদার এক্সটেনশনের জন্য ইনোভেশন গ্রান্ডের কাছে সাবমিট করেছেন। বর্তমানে তাদের তৈরিকৃত গ্লাসটিতে দুই রকমের (স্টীল ও প্লাস্টিক) ফ্রেম ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে প্লাস্টিকের ফ্রেম দিয়ে একটি সাধারণ চশমার মতো করে ব্যবহারকারীর হাতে ২০২১ সাল নাগাদ পৌঁছিয়ে যাবে যদি সঠিক সময়ের মধ্যে তারা পরবর্তী ফান্ডিং টা পেয়ে যান। এবং তারা কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে এবং ব্যবহারকারী উপকৃত হলে তাদের কাজের সার্থকতার পূর্ণ স্বাদ পাবে।



ফারহানা ইয়াসমিন,

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,

অর্থ সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।


 


Comments (0)

Comments