মোংলা প্রতিনিধিঃ
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন উন্মুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও ঋণগ্রস্ত জেলেদের মধ্যে জলদস্যু ও চাঁদাবাজদের কবলে পড়ার তীব্র আতঙ্ক কাজ করছে।
দীর্ঘ তিন মাসের মৎস্য আহরণ নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আগামীকাল ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছেন বনজীবী ও জেলেরা। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বনের প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, যা আজ মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে। সুন্দরবন সংলগ্ন জনপদগুলোতে এখন নৌকা মেরামত, জাল বোনা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের যোগাড় নিয়ে চরম ব্যস্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে এই জীবিকার পথ উন্মুক্ত হওয়ার আনন্দ ছাপিয়ে জেলেদের মনে ভর করেছে গভীর সংশয়। বন বিভাগ থেকে পাশ-পারমিট সংগ্রহের প্রস্তুতি চললেও, বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর নিজেদের নিরাপত্তা এবং উপার্জিত অর্থের সুরক্ষাকে ঘিরেই প্রধানত এই উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। মূলত ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বনে প্রবেশ করা জেলেদের জন্য জলদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অবৈধ শিকারি চক্রের দৌরাত্ম্য এক বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
ভুক্তভোগী জেলেদের অভিযোগ অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন জীবন নির্বাহের জন্য তাদের এনজিও এবং স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হয়েছে। এখন বনে প্রবেশ করলেই তাদের আয়ের একটি বড় অংশ জলদস্যুদের ‘স্লিপ’ বা টোকেন মানি হিসেবে চাঁদা দিতে হতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে জানিয়েছেন যে, অতীতে প্রতি ১৫ দিনের যাত্রার জন্য নৌকাপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে দস্যুদের আগাম চাঁদা দিতে বাধ্য করা হতো। এছাড়া বনে দায়িত্বরত অসাধু বনকর্মীদের বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিষ দিয়ে মাছ শিকার এবং ফাঁদ পেতে হরিণ শিকারি চক্রের অবৈধ তৎপরতা বনজীবীদের নিরাপত্তাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। এই চক্রগুলোর সাথে সংঘাতের ভয়ে অনেক জেলে বনে ফিরতে দ্বিধাবোধ করছেন, কারণ মাছ ও কাঁকড়া আহরণের পর চাঁদা ও অবৈধ খরচের হিসাব মেলালে তাদের পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলেদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের অপারেশন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. শামসুল আরেফীন জানিয়েছেন যে, সুন্দরবনে জেলেদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে লোকালয়ে লুকিয়ে থাকা দস্যুদের সহযোগীরা, যারা জেলেদের কাছ থেকে টোকেনের নামে চাঁদা আদায় করে, তাদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহলের মাধ্যমে দস্যুদের দৌরাত্ম্য নির্মূল করা সম্ভব হবে। তবে বনজীবীদের মতে, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বনের অভ্যন্তরে নিয়মিত টহল জোরদার এবং অসাধু চক্রের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে না দিলে তাদের আতঙ্ক দূর করা সম্ভব নয়।
সুন্দরবনকেন্দ্রিক এই অর্থনীতি মূলত হাজার হাজার পরিবারের জীবন-জীবিকার একমাত্র উৎস। কিন্তু প্রতি বছর নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী সময়ে জলদস্যু ও চাঁদাবাজদের আধিপত্যের যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা উপকূলীয় অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। যদি প্রশাসনের কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও চাঁদাবাজদের এই দুষ্টচক্র সক্রিয় থাকে, তবে বনজীবীরা কেবল অর্থনৈতিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং বনের সামগ্রিক নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে। আগামী কয়েক মাস জেলেদের জন্য কতটা নিরাপদ হবে, তা এখন প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং আইন প্রয়োগের কঠোরতার ওপরই নির্ভর করছে। সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে হলে দস্যুমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
২ ঘন্টা ২ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৩৫ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৪৯ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ৭ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ১৩ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ১২ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ৪৯ মিনিট আগে