অন্নকূট মহোৎসব হিন্দুধর্মের একটি প্রাচীন ও তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। ‘অন্ন’ অর্থ খাদ্য এবং ‘কূট’ অর্থ স্তূপ বা পাহাড়। অর্থাৎ, বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য দিয়ে পাহাড়ের মতো স্তূপ তৈরি করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশে নিবেদন করাই অন্নকূটের মূল আয়োজন। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা, অন্নের মর্যাদা, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং জীবের কল্যাণ কামনা।অন্নকূট মহোৎসবের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের গোবর্ধন লীলার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বৈষ্ণব ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, একসময় বৃন্দাবনবাসী বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্রের পূজা করতেন। বালক শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের বোঝান, মানুষের জীবনধারণ ও জীবিকার জন্য প্রকৃতি, গোবর্ধন পর্বত, বনভূমি, নদী এবং গবাদিপশুর অবদান অপরিসীম। তাই প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত।শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে বৃন্দাবনবাসী গোবর্ধন পর্বতের পূজা ও অন্নভোগের আয়োজন করেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে দেবরাজ ইন্দ্র প্রবল বৃষ্টি ও ঝড় সৃষ্টি করেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পর্বত তুলে ধরে সাত দিন ধরে বৃন্দাবনবাসী ও গবাদিপশুকে আশ্রয় দেন। অবশেষে ইন্দ্র নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এই লীলাকে স্মরণ করেই গোবর্ধন পূজা ও অন্নকূট মহোৎসব পালিত হয়।সাধারণত দীপাবলি বা কালীপূজার পরদিন কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে অন্নকূট মহোৎসব পালিত হয়। এদিন মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণের বিশেষ পূজা, আরতি, কীর্তন ও অন্নভোগ নিবেদনের আয়োজন করা হয়।উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলো নানা রকম খাবার দিয়ে অন্নের পাহাড় তৈরি করা। ভাত, খিচুড়ি, পোলাও, ডাল, তরকারি, মিষ্টি, ফলমূল, দুধ, দই, মাখন ও পায়েসসহ বিভিন্ন নিরামিষ পদ নিবেদন করা হয়।অনেক মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশে ৫৬ ধরনের খাবার নিবেদন করা হয়, যা ‘ছাপ্পান ভোগ’ নামে পরিচিত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণ সাত দিন গোবর্ধন পর্বত ধারণ করেছিলেন। প্রতিদিন আটবার আহারের হিসাব থেকে ৭ গুণ ৮ অর্থাৎ ৫৬ ভোগের ধারণার প্রচলন হয়েছে।পূজা শেষে নিবেদিত খাবার প্রসাদ হিসেবে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। অনেক স্থানে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যেও অন্ন বিতরণ করা হয়।অন্নকূট মহোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এর মধ্যে রয়েছে গভীর জীবনদর্শন। অন্ন মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। কৃষক, মাটি, পানি, বৃষ্টি ও প্রকৃতির সম্মিলিত অবদানেই খাদ্য উৎপাদিত হয়। তাই অন্নের অপচয় না করা এবং ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া এই উৎসবের অন্যতম মানবিক শিক্ষা।গোবর্ধন লীলার মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ প্রকৃতির গুরুত্ব ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বার্তা দিয়েছেন। পাহাড়, নদী, বনভূমি, জলাশয় ও জীববৈচিত্র্য মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। প্রকৃতিকে অবহেলা করে মানুষের কল্যাণ সম্ভব নয়।বিশেষ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে নদী-খাল ভরাট, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সংকট ও পরিবেশের অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে অন্নকূটের প্রকৃতিবান্ধব শিক্ষা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্দির ও আশ্রমে অন্নকূট মহোৎসব ভক্তি, আনন্দ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয়। এ উৎসব মানুষে মানুষে সহযোগিতা, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার বন্ধন দৃঢ় করে।অন্নকূট আমাদের শেখায়, অন্নের প্রতি শ্রদ্ধা মানে জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা মানে নিজের অস্তিত্বের উৎসকে সম্মান করা। ঈশ্বরের উদ্দেশে অন্ন নিবেদনের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন সেই অন্ন ক্ষুধার্ত মানুষেরও উপকারে আসে।অন্নের পাহাড় শুধু প্রাচুর্যের প্রতীক নয়, এটি ভাগ করে নেওয়ার শিক্ষা। ভক্তির সঙ্গে মানবসেবা, অন্নের সঠিক ব্যবহার এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের অঙ্গীকার যুক্ত হলেই অন্নকূট মহোৎসবের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024