|
Date: 2026-11-07 19:15:49 |
নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবিপ্রবি) পাঁচ শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ার গুরুতর অনিয়ম সামনে এসেছে । সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অডিট আপত্তিতে বিষয়টি উঠে এসেছে। ইউজিসি তাদের বেতন-ভাতা বন্ধ করে বাজেটে কোনো বরাদ্দও রাখেনি। তবে কমিশনের নির্দেশ ও সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করে নিয়মিত তাদের বেতন-ভাতা দিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক সুপারিশ, প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই বিতর্কিত নিয়োগগুলো সম্পন্ন করা হয়েছিল।
ইউজিসির বাজেট অ্যাসেসমেন্ট দল গত ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ সংশোধিত ও ২০২৬-২৭ মূল বাজেট যাচাই করে। এ সময় ২৬টি পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়। এর প্রথমটিই অননুমোদিত নিয়োগ।
ইউজিসির অডিট আপত্তিতে বলা হয়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রভাষক পদে বয়সসীমা ছিল ৩০ এবং সহকারী অধ্যাপক পদে ৩৫ বছর। কিন্তু ব্যক্তিগত নথি যাচাইয়ে দেখা যায়, আবেদনের শেষ তারিখে পাঁচজনের বয়সই সীমার বেশি ছিল। তাঁরা হলেন সমাজকর্ম বিভাগের (১) ড. এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান। সে সময় তার বয়স ছিল ৪৫ বছর ৮ মাস। (২) সিএসই বিভাগের ড. মো. মাহমুদুল আলম। তার বয়স ছিল ৪০ বছর ১ মাস। (৩) ৪২ বছর ১০ মাস বয়স ছিল গণিত বিভাগের ড. মুহাম্মদ শাহ জালালের। (৪) হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ড. সৈয়দ নাজমুল হুদার বয়স ছিল ৩৮ বছর ৯ মাস আর (৫) সমাজকর্ম বিভাগের ড. আল মামুন সরকারের বয়স ছিল ৩৯ বছর ৫ মাস। প্রথম তিনজন সহকারী অধ্যাপক এবং শেষ দুজন প্রভাষক পদে নিয়োগ পান।
নিয়মবহির্ভূত এই নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অডিট আপত্তিতে আরো বলা হয় , বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান ও প্রচলিত আইনের আলোকে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়োগ নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় এসব পদের বেতন-ভাতা বাবদ কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। কমিশন আরও বলেছে, পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তির জন্য একাধিকবার স্মরণ করানো হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সাড়া মেলেনি। এর ফলে কিছু খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া যায়নি। পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তি না হলে চাহিদা ও বরাদ্দের ব্যবধান আরও বাড়বে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
খোজ নিয়ে জানা যায়, ইউজিসির বাজেট অ্যাসেসমেন্ট দল ২০২৫-২৬ সংশোধিত ও ২০২৬-২৭ মূল বাজেট যাচাই করে এমন অডিট আপত্তির পর দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন বন্ধ ও চাকরিচ্যুতসহ ব্যবস্থা নেওয়া হলেও জাবিপ্রবিতে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাজেটে বেতন বন্ধ রাখলেও উল্টো তাদের বেতন দিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. সারোয়ার জাহান বলেন, ইউজিসির চিঠিটি তাঁরা পেয়েছেন এবং এর জবাব দেওয়া হবে। চিঠিটি ইস্যুর ৪ মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোন ব্যবস্থা নেওয়া বা তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। ইউজিসি আরও পদক্ষেপ নিতে চাইলে তখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।। ওই পাঁচজন বেতন পাচ্ছেন কি না, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, তাঁরা বেতন পাচ্ছেন। কোন খাত থেকে দেওয়া হচ্ছে, তা অ্যাকাউন্টস শাখা বলতে পারবে বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব ও অর্থ বিভাগের উপ-পরিচালক আবদুল জলিল মিয়া বলেন, এসব শিক্ষকের বেতন নিয়মিত বেতন-ভাতা খাত থেকেই দেওয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত নির্দেশ না এলে তাঁরা বেতন দিতে থাকবেন। বরাদ্দ ফুরিয়ে গেলে ঘাটতি কীভাবে মেটানো হবে, সে সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করবে বলেও জানান তিনি।
এ দিকে এধরনের ঘাটতির কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল বাজেট কমছে এবং এসব পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তি না হলে চাহিদা ও বরাদ্দের ব্যবধান আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেছে ইউজিসি।
সিএসই বিভাগের ড. মো. মাহমুদুল আলমের কাছে তাদের বিরুদ্ধে আসা এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই বিতর্কিত নিয়োগগুলো সম্পন্ন হয়েছিল। নিয়মবহির্ভূত ভাবে নিয়োগ পাওয়া এসব আওয়ামীপন্থী শিক্ষক নিজেদের যোগ্যতার ঘাটতি ঢাকতে বিগত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা আমলে সরকারের হয়ে নানা কাজ করে গিয়েছেন।
ড. এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিগত সরকারের সময়ে তিনি ‘মুজিব শতবর্ষের ইতিহাস’ গ্রন্থ রচনা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংবাদমাধ্যমে কলাম লিখে ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতা ও দমন-পীড়নের পক্ষে বৈধতা তৈরির চেষ্টা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে নিয়ে কটূক্তি করে লেখা প্রকাশের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
ড. সৈয়দ নাজমুল হুদা ও ড. মাহমুদুল আলম দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ‘রোড টু স্মার্ট বাংলাদেশ’ কর্মসূচিতে নৌকার পক্ষে তৃণমূল পর্যায়ে ভোট প্রার্থনার ক্যাম্পেইনার ও প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছিলেন।
ড. মো. আল মামুন সরকার ‘উন্নয়নের রোল মডেল শেখ হাসিনা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন ও টিভি টকশোতে শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে নিয়ে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
© Deshchitro 2024