সাড়ে আট হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের প্রত্যাশা, বন বিভাগের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৮ কোটি টাকা; তদারকি ও নিরাপত্তায় বাড়তি নজরদারি
সুন্দরবনের দুবলার চরে শুরু হয়েছে পাঁচ মাসব্যাপী শুঁটকি মৌসুম। বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন চারটি জেলেপল্লি আলোরকোল, মাঝেরকেল্লা, নারিকেলবাড়িয়া ও শেলার চর ঘিরে শুরু হয়েছে মাছ আহরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শুঁটকি উৎপাদনের বিশাল কর্মযজ্ঞ। দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় জেলা থেকে জেলে, বহদ্দার (মহাজন), আড়তদার, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের আগমনে মুখর হয়ে উঠছে এই অস্থায়ী জনপদ।
৩০ অক্টোবর ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এই মৌসুম চলবে আগামী বছরের মার্চের শেষ পর্যন্ত। মৌসুম ঘিরে এবার ১০ হাজারের বেশি জেলে ও মৎস্যজীবীর সমাগমের প্রত্যাশা করছে বন বিভাগ। ইতিমধ্যে সাত হাজারের বেশি জেলে দুবলার চরে পৌঁছেছেন। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন মাছের ব্যবসায়ী ও বহদ্দাররা। তবে মৌসুমের শুরুতেই বৈরী আবহাওয়া, উত্তাল সাগর, ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসের কারণে মাছ আহরণ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক জেলে ট্রলার নিয়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
শুধু মাছ ধরা নয়, দুবলার চরের এই পাঁচ মাসের কার্যক্রমকে ঘিরে গড়ে ওঠে কয়েক শ কোটি টাকার সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। মাছ আহরণ থেকে শুরু করে শুঁটকি তৈরি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিস্তৃত এই বাণিজ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থাকেন হাজারো মানুষ। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষা করে এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করাই এখন বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অন্যতম দায়িত্ব।
উৎপাদন ও রাজস্বের বড় লক্ষ্যমাত্রা
চলতি মৌসুমে দুবলার চর থেকে সাড়ে আট হাজার মেট্রিক টনের বেশি শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৭ হাজার ৯৬০ মেট্রিক টন শুঁটকি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই হিসাবে এবার উৎপাদন বাড়ানোর প্রত্যাশা রয়েছে।
অন্যদিকে, চলতি মৌসুমে দুবলার চর থেকে বন বিভাগের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ কোটি টাকা। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছিল প্রায় ৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ গতবারের আদায়ের তুলনায় এবার ৭৫ লাখ টাকা বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বন বিভাগ।
এই রাজস্বের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অনুমতিপত্র, মাছ আহরণ, অস্থায়ী স্থাপনা ও অন্যান্য নির্ধারিত ফি। উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে বৈরী আবহাওয়া, জলদস্যুতা ও মাছ আহরণে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন এবং রাজস্ব—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়তে পারে।
চারটি শুঁটকিপল্লিতে হাজারো জেলের বসতি
দুবলার চরকেন্দ্রিক শুঁটকি কার্যক্রম মূলত চারটি পল্লিতে পরিচালিত হয়। এগুলো হলো—
আলোরকোল
মাঝেরকেল্লা
নারিকেলবাড়িয়া
শেলার চর।
বন বিভাগের অনুমতি অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলেদের বসবাসের জন্য প্রায় ৯০০টি অস্থায়ী ঘর, মাছ কেনাবেচার জন্য ১০০টি ডিপো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির জন্য ১০০টি দোকান স্থাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এসব স্থাপনা নির্মাণে সুন্দরবনের কোনো গাছপালা ব্যবহার করা যাবে না। জেলেদের নিজ নিজ এলাকা থেকে প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী নিয়ে আসতে বলা হয়েছে।
প্রতিটি পল্লিতে মাছ শুকানোর জন্য তৈরি করা হয় বাঁশের মাচা ও চাতাল। পাশাপাশি থাকে মাছ সংরক্ষণের জায়গা, ডিপো, খাবারের দোকান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার। পাঁচ মাসের জন্য এসব স্থাপনা ঘিরে গড়ে ওঠে একটি অস্থায়ী জনপদ।
মাছের প্রজাতি ও শুঁটকি উৎপাদনের হিসাব
দুবলার চরে সাধারণত লইট্টা, ছুরি, চিংড়ি, রূপচাঁদা, পোয়া, ফাইস্যা, কোরাল, লাক্ষা, চ্যালা ও বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রজাতির মাছ আহরণ করা হয়। মাছের প্রজাতি অনুযায়ী আলাদা পদ্ধতিতে শুঁটকি তৈরি করা হয়।
মাছ ধরার পর প্রথমে বাছাই ও পরিষ্কার করা হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী লবণ প্রয়োগ করে বাঁশের মাচা, জাল কিংবা নির্ধারিত চাতালে রোদে শুকানো হয়। কয়েক দিন ধরে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর তৈরি হয় বাজারজাত করার উপযোগী শুঁটকি।
গত মৌসুমের উৎপাদনসংক্রান্ত প্রকাশিত পরিসংখ্যানে প্রায় ৭ হাজার ৯৬০ মেট্রিক টন শুঁটকির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উৎপাদনের হিসাবের কিছু পার্থক্য রয়েছে। ফলে বন বিভাগের চূড়ান্ত মৌসুমি উৎপাদন প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রকৃত পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। চলতি মৌসুমে সাড়ে আট হাজার মেট্রিক টনের বেশি উৎপাদনের প্রত্যাশা রয়েছে।
শতকোটি টাকার বাণিজ্য, উপকূলের মানুষের জীবিকা
দুবলার চরের শুঁটকি মৌসুমকে কেন্দ্র করে শুধু জেলে ও বহদ্দারদের আয় নয়, উপকূলীয় অঞ্চলের বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। মাছ আহরণ, শুঁটকি উৎপাদন, শ্রমিকের মজুরি, নৌযান ভাড়া, জ্বালানি, খাদ্যসামগ্রী, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বিক্রিসহ বিভিন্ন খাতে অর্থের লেনদেন হয়।
মাছ ধরার ট্রলার পরিচালনায় জ্বালানি, জাল, বরফ, খাবার ও অন্যান্য উপকরণ কিনতে হয়। বহদ্দাররা জেলেদের মাছ ধরার জন্য আগাম অর্থ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করেন। জেলেরা মাছ ধরে এনে নির্ধারিত ডিপোতে বিক্রি করেন। পরে সেই মাছ থেকে শুঁটকি তৈরি করে ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান।
প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, দুবলার চর থেকে প্রতিবছর প্রায় ১৭৫ কোটি টাকার শুঁটকি এবং ১৫০ কোটি টাকার তাজা মাছ দেশের বাজারে সরবরাহ করা হয়। এই হিসাবে শুঁটকি ও তাজা মাছ মিলিয়ে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩২৫ কোটি টাকা। তবে এটি সামগ্রিক বাণিজ্যের একটি প্রকাশিত আনুমানিক হিসাব; চলতি মৌসুমের চূড়ান্ত বিক্রির পরিসংখ্যান নয়।
খুলনা, বাগেরহাট, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে দুবলার চরের শুঁটকির চাহিদা রয়েছে। দেশের বাইরেও কিছু শুঁটকি রপ্তানি হয়। ফলে এই বাণিজ্য দেশের মৎস্যসম্পদভিত্তিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বন বিভাগের তদারকি ও নজরদারি
দুবলার চরের শুঁটকি মৌসুমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হলো বন বিভাগের তদারকি। কারণ এই কার্যক্রম পরিচালিত হয় সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায়। ফলে জেলেদের জীবিকা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বনের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হয়।
বন বিভাগের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—
জেলেদের পাস ও পারমিট যাচাই করে নির্ধারিত এলাকায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া।
অনুমোদিত জেলে, ট্রলার, বহদ্দার ও অস্থায়ী স্থাপনার হিসাব সংরক্ষণ।
অনুমোদিত ঘর, দোকান ও মাছের ডিপোর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ।
সুন্দরবনের গাছ কাটা ও বনজ সম্পদ ব্যবহার বন্ধ রাখা।
বন্যপ্রাণী শিকার ও অবৈধ মাছ আহরণ প্রতিরোধ।
সুন্দরবনের নদী-খালে অবৈধ প্রবেশ ও মাছ ধরা বন্ধ করা।
নির্ধারিত রাজস্ব ও ফি আদায় নিশ্চিত করা।
শুঁটকিপল্লিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত নিয়ম অনুসরণ হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ।
বন বিভাগের টহল ফাঁড়ির মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি পরিচালনা।
বন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, জেলেদের সাগরে মাছ আহরণ করতে হবে। সুন্দরবনের ভেতরের নদী-খালে প্রবেশ করে মাছ ধরা কিংবা বনজ সম্পদ ব্যবহার করা যাবে না। এসব নিয়ম ভঙ্গ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
মৌসুম শুরুর আগেই ১২০০ ট্রলারের যাত্রা, তদারকি নিয়ে প্রশ্ন
চলতি মৌসুমের শুরুতে বন বিভাগের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২৯ অক্টোবর মৌসুম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর আগেই প্রায় ১ হাজার ২০০ মাছ ধরার ট্রলার দুবলার চরের উদ্দেশে যাত্রা করে বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বন বিভাগের পক্ষ থেকে অনুমতি ছাড়া সুন্দরবনে প্রবেশ না করার জন্য মাইকিং এবং চিলা বাজার ও জয়মনিঘোল এলাকায় নজরদারি চালানোর তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক ট্রলার একযোগে চলে যাওয়ার ঘটনায় অনুমতিপত্র যাচাই ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কতটি ট্রলার যথাযথ পাস-পারমিট নিয়ে প্রবেশ করেছে, কতটি ট্রলার নির্ধারিত সময়ের আগে যাত্রা করেছে, কতজন জেলে ও বহদ্দার নিবন্ধিত হয়েছেন এবং অনুমোদনবহির্ভূত প্রবেশের ঘটনায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য বন বিভাগের কাছ থেকে জানা প্রয়োজন।
বিশেষ করে অনুমতিপত্রের সংখ্যা, বাস্তবে অবস্থানরত জেলে ও ট্রলারের সংখ্যা এবং রাজস্ব আদায়ের হিসাবের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।
জলদস্যুতা ও জেলেদের নিরাপত্তা
শুঁটকি মৌসুমে জেলেদের অন্যতম বড় উদ্বেগ জলদস্যুতা। বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে জলদস্যুদের কবলে পড়া, অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি ও মাছ লুটের আশঙ্কা তাঁদের মধ্যে রয়েছে।
এ কারণে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী, খাল ও সাগরসংলগ্ন এলাকায় টহল জোরদার করা, সন্দেহজনক নৌযান পর্যবেক্ষণ এবং অপহরণের ঘটনায় দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।
কয়েকটি দস্যু বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও কিছু দস্যু দলের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে পুরো মৌসুমে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর জন্য বড় দায়িত্ব।
ঘূর্ণিঝড় ও বৈরী আবহাওয়ায় উৎপাদনের ঝুঁকি
চলতি মৌসুমের শুরুতেই বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাছ আহরণ ব্যাহত হয়েছে। শক্তিশালী বাতাস, ভারী বৃষ্টি ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে জেলেরা সাগরে যেতে পারেননি। অনেক ট্রলার সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে আশ্রয় নিয়েছে।
এতে মাছ আহরণের পাশাপাশি শুঁটকি উৎপাদনেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ শুঁটকি তৈরির প্রধান উপাদান হলো রোদ ও অনুকূল আবহাওয়া। বৃষ্টিতে শুকাতে দেওয়া মাছ ভিজে গেলে পচন ধরতে পারে, নষ্ট হতে পারে উৎপাদিত শুঁটকির মান। এতে জেলে ও বহদ্দারদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই শুঁটকি উৎপাদন জরুরি
দুবলার চরের শুঁটকি বাণিজ্য যেমন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও অত্যন্ত জরুরি। হাজারো মানুষের সাময়িক বসবাস ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের ফলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়। প্লাস্টিক, পলিথিন, মাছের উচ্ছিষ্ট, তেল ও অন্যান্য বর্জ্য নদী-খালে ছড়িয়ে পড়লে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ জন্য শুঁটকিপল্লিতে নির্দিষ্ট বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ ব্যবস্থা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাছের মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বন বিভাগের কাছে যেসব পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ
চলতি মৌসুমের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে বন বিভাগের কাছ থেকে কয়েকটি তথ্যের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন—
মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ও বহদ্দারের সংখ্যা।
অনুমোদিত ট্রলারের সংখ্যা এবং বাস্তবে অবস্থানরত ট্রলারের সংখ্যা।
চারটি শুঁটকিপল্লিতে অনুমোদিত ঘর, ডিপো ও দোকানের সংখ্যা।
গত মৌসুমে মোট মাছ আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদনের পরিমাণ।
চলতি মৌসুমের প্রজাতিভিত্তিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা।
গত মৌসুমে বন বিভাগের মোট রাজস্ব আদায় এবং খাতভিত্তিক হিসাব।
চলতি মৌসুমে ৮ কোটি টাকা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাসভিত্তিক আদায়ের হিসাব।
অবৈধভাবে প্রবেশকারী ট্রলার, অনুমতিপত্রবিহীন জেলে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার পরিসংখ্যান।
বন বিভাগের টহল কার্যক্রম, জনবল, টহলযান এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের তথ্য।
বন্যপ্রাণী শিকার, বনজ সম্পদ ধ্বংস, নদী-খালে অবৈধ মাছ আহরণ ও পরিবেশদূষণের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান এবং মামলার সংখ্যা।
এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে শুঁটকি মৌসুমের অর্থনৈতিক অবদান, বন বিভাগের কার্যক্রম এবং সুন্দরবন সংরক্ষণে তদারকির বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হবে।
অর্থনীতি ও পরিবেশের ভারসাম্যই বড় চ্যালেঞ্জ
দুবলার চরের পাঁচ মাসের শুঁটকি মৌসুম হাজারো জেলে ও উপকূলীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একই সঙ্গে এটি বন বিভাগের রাজস্ব আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং দেশের মৎস্য অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। কিন্তু এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না।
এবারের মৌসুমে ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় এবং সাড়ে আট হাজার মেট্রিক টনের বেশি শুঁটকি উৎপাদনের প্রত্যাশা রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি জেলেদের নিরাপত্তা, অনুমতিপত্রের স্বচ্ছতা, অবৈধ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে দুবলার চরের শুঁটকি মৌসুম এখন শুধু মাছ আহরণ ও বাণিজ্যের বিষয় নয়; এটি সুন্দরবন ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় কর্মসংস্থান, সরকারি রাজস্ব এবং পরিবেশ সংরক্ষণের একটি বড় পরীক্ষা। বন বিভাগের কার্যকর তদারকি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও টেকসই করতে।