|
Date: 2026-10-29 22:01:37 |
একসময় ঢাকার ধামরাই উপজেলার নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে পাওয়া যেত নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। বর্ষা মৌসুমে পানিতে ভরে উঠত বিল, খাল ও নিচু জমি। জেলেদের জালে ধরা পড়ত পুঁটি, মলা, ঢেলা, টেংরা, শিং, মাগুর, কৈ, শোল ও টাকিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এসব মাছের অনেক প্রজাতি আগের মতো সহজে পাওয়া যায় না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। নদী-খাল ভরাট, পানিদূষণ, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ এবং মাছ ধরার ক্ষতিকর পদ্ধতি এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কলকারখানার বর্জ্যে দূষণের শঙ্কা
ধামরাইয়ের বিভিন্ন কলকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য নদী ও জলাশয়ে ফেলা হলে তা জলজ পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্যের রাসায়নিক উপাদান পানির গুণগত মান নষ্ট করতে পারে, কমিয়ে দিতে পারে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ। এতে মাছের স্বাভাবিক জীবনযাপন, প্রজনন ও পোনা বেঁচে থাকার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যথাযথ শোধনাগার ব্যবহার এবং বর্জ্য নিষ্কাশনব্যবস্থা নিয়মিত তদারক করা জরুরি। কোন কোন কারখানার বর্জ্য নদীতে পড়ছে এবং তার প্রভাব কতটা—তা নির্ধারণে পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
চায়না জাল ও বিষটোপে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত
দেশীয় মাছ কমে যাওয়ার পেছনে মাছ ধরার অনিয়ন্ত্রিত ও ক্ষতিকর পদ্ধতিও উদ্বেগের কারণ। স্থানীয়ভাবে ‘চায়না জাল’ নামে পরিচিত সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল দিয়ে মাছ ধরার ফলে অনেক সময় ছোট মাছ ও পোনাও ধরা পড়ে। এতে মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে বড় মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অন্যদিকে, মাছ ধরতে বিষ বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হলে তা শুধু মাছ নয়, অন্যান্য জলজ প্রাণী ও পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই অবৈধ জাল ও বিষ দিয়ে মাছ ধরার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।
রাস্তা-ঘাটে বাধাগ্রস্ত নদীর পানি বিলের প্রবেশপথ
নদী ও বিলের মধ্যে পানির স্বাভাবিক সংযোগ দেশীয় মাছের প্রজনন ও বিচরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষাকালে নদীর পানি বিলে প্রবেশ করলে অনেক প্রজাতির মাছ সেখানে ডিম ছাড়ে, বংশবিস্তার করে এবং নতুন জলাভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু অপরিকল্পিত রাস্তা-ঘাট, কালভার্টের অপর্যাপ্ততা কিংবা পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেলে নদীর পানি স্বাভাবিকভাবে বিলে প্রবেশ করতে পারে না। এতে মাছের চলাচল ও প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের সমস্যা রয়েছে কি না, তা সরেজমিনে পরিদর্শন করে পানি চলাচলের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
ভরাট ও দখলে হারিয়ে যাচ্ছে নদী-খাল
প্রাকৃতিক নদী ও খাল একটি এলাকার জলপ্রবাহ সচল রাখার পাশাপাশি দেশীয় মাছের আবাসস্থল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু নদী-খাল ভরাট, দখল এবং নাব্যতা কমে যাওয়ার কারণে অনেক স্থানে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কোথাও কোথাও শুষ্ক মৌসুমে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় মাছের নিরাপদ আশ্রয় ও প্রজননক্ষেত্রও সংকুচিত হয়।
নদী ও খাল হারিয়ে গেলে শুধু মাছের বৈচিত্র্যই কমে না; বর্ষার পানি নিষ্কাশন, কৃষিকাজ এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই অবৈধ দখল ও ভরাট বন্ধের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় খনন, পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং জলাশয় সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।
জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তায় প্রভাব
দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন স্থানীয় জেলে ও ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ীরা। মাছ ধরা ও বিক্রির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় দেশীয় মাছের সরবরাহও কমতে পারে। একই সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে স্থানীয় জলজ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
ধামরাইয়ের দেশীয় মাছ রক্ষায় শিল্পবর্জ্য শোধন নিশ্চিত করা, নদী-খাল দখল ও ভরাট বন্ধ করা, পানি চলাচলের পথ সচল রাখা এবং ক্ষতিকর জাল ও বিষ দিয়ে মাছ ধরা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি নদী ও খালের দূষণ পরীক্ষা, মাছের প্রজাতি ও প্রাপ্যতা নিয়ে জরিপ এবং স্থানীয় জেলেদের বক্তব্য সংগ্রহ করা জরুরি।
© Deshchitro 2024