কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা: সৌভাগ্যের আরাধনা


দুর্গাপূজার ঢাক থেমেছে, প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হয়েছে উৎসবের উচ্ছ্বাস। মণ্ডপের আলো নিভতেই মনজুড়ে নেমেছে বিদায়ের বিষাদ। কিন্তু বাঙালির উৎসবের জীবন থেমে থাকে না। বিষাদের রেশ কাটতে না কাটতেই দরজায় কড়া নাড়ে আরেক উৎসব—কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। মা দুর্গার বিদায়ে যে ঘরে মন খারাপের ছায়া, সেই ঘরেই এবার প্রদীপ জ্বালিয়ে স্বাগত জানানো হবে অন্ন, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক দেবী লক্ষ্মীকে। তবে প্রশ্ন হলো, লক্ষ্মী কি কেবল ধনসম্পদের দেবী? যে সমাজে মানুষ অভাবের সঙ্গে লড়াই করে, কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পান না, শ্রমজীবী মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খান, সেখানে লক্ষ্মী আরাধনার প্রকৃত তাৎপর্য কোথায়? এই প্রশ্ন সামনে রেখেই ফিরে আসে কোজাগরী পূর্ণিমা—যা আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকজ ঐতিহ্য ও সামাজিক দায়িত্ববোধ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়।বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের ঐতিহ্যে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার স্থান স্বতন্ত্র। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের সূচনা, পূজার কয়েক দিনের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, তারপর বিজয়া দশমীর বিদায়। এর পরপরই আসে লক্ষ্মীপূজা। দুর্গাপূজা যেখানে সর্বজনীন উৎসবের আবহে মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের মিলন ঘটায়, সেখানে লক্ষ্মীপূজার প্রধান আয়োজন হয় ঘরে ঘরে। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে পূজার প্রস্তুতি নেন, উঠানে আঁকা হয় আলপনা, জ্বলে প্রদীপ, সাজানো হয় নৈবেদ্য। এই ঘরোয়া আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাঙালির পারিবারিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়।আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। ‘কোজাগরী’ শব্দের অর্থ ‘কে জেগে আছ?’ প্রচলিত হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী মর্ত্যে নেমে ঘরে ঘরে ঘুরে জানতে চান, কে জেগে আছে। যাঁরা জেগে থেকে ভক্তিভরে দেবীর আরাধনা করেন, তাঁদের গৃহে দেবীর আশীর্বাদ আসে বলে বিশ্বাস করা হয়। এই বিশ্বাস থেকেই কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে লক্ষ্মীপূজার বিশেষ প্রচলন।দেবী লক্ষ্মীকে হিন্দু শাস্ত্র ও পুরাণে ধন, সম্পদ, সৌভাগ্য, সুখ ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর কৃপায় মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য, প্রতিষ্ঠা ও শান্তি আসে—এমন বিশ্বাস বহুদিনের। তাই শুধু কোজাগরী পূর্ণিমাতেই নয়, বাংলার বহু হিন্দু পরিবারে প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপূজার রীতি রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সংক্রান্তি ও দীপাবলির সময়ও নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়।কিন্তু ‘কে জেগে আছ’—এই প্রশ্নের একটি সামাজিক তাৎপর্যও আমরা খুঁজে নিতে পারি। আমরা কি অন্যের দুঃখ-কষ্টের বিষয়ে সচেতন? সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা কি জেগে আছি? ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাখ্যা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রয়োজন সর্বজনীন। লক্ষ্মীপূজার রাতে প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি সমাজের অন্ধকার দূর করার অঙ্গীকারও জরুরি।দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে বাংলার কৃষিজীবনের সম্পর্ক গভীর। প্রাচীন বাংলার অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। ধান ছিল মানুষের প্রধান খাদ্য, আর গোলাভরা ধান মানেই ছিল সংসারের সচ্ছলতা ও নিরাপত্তা। তাই ধান, চাল, অন্ন ও খাদ্যশস্যকে লক্ষ্মীর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। গোলাঘরকে লক্ষ্মীর আবাস ভাবার পেছনেও রয়েছে এই কৃষিনির্ভর জীবনদর্শন।ধানের শিষ, শস্যের ভান্ডার, মুদ্রা এবং দেবী লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ দিয়ে আলপনা আঁকার রীতি সেই ঐতিহ্যেরই পরিচায়ক। বিশ্বাস করা হয়, লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ ঘরে আঁকলে দেবীর আগমন ঘটে। এভাবে ধর্মীয় আচার ও কৃষিজীবনের অভিজ্ঞতা একাকার হয়ে গেছে বাঙালির সংস্কৃতিতে।কিন্তু আজ খাদ্যশস্যের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অন্যদিকে বাজারের অনিশ্চয়তা—কৃষককে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। যাঁদের শ্রমে ঘরে ঘরে অন্ন পৌঁছায়, তাঁদের জীবনই যদি অনিশ্চিত থাকে, তাহলে সমৃদ্ধির ধারণা পূর্ণতা পায় কীভাবে? লক্ষ্মীপূজার প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে কৃষকের শ্রমের মর্যাদা দেওয়া, খাদ্যের অপচয় বন্ধ করা এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে ন্যায্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা।যে ঘরে অন্নের সম্মান নেই, যে সমাজে খাদ্য নষ্ট হয় অথচ মানুষ অনাহারে থাকে, সেই সমাজে লক্ষ্মী আরাধনার মানবিক আবেদন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অন্নের প্রতি শ্রদ্ধা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বোধেরও অংশ।দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা। বাংলার লোকবিশ্বাসে এর সঙ্গে কৃষিজীবনের একটি বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে। ধানক্ষেত ও গোলাঘরের আশপাশে ইঁদুরের উপদ্রবে খাদ্যশস্যের ক্ষতি হয়। পেঁচা ইঁদুর খেয়ে সেই ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে। তাই পেঁচাকে শস্যরক্ষার সহায়ক প্রাণী হিসেবে দেখা হয়েছে। দেবীর বাহন হিসেবে পেঁচার উপস্থিতি কৃষি, প্রকৃতি ও ধর্মীয় কল্পনার মধ্যকার সম্পর্ককে তুলে ধরে।এই লোকজ ব্যাখ্যা আমাদের প্রকৃতির ভারসাম্যের কথাও মনে করিয়ে দেয়। মানুষ প্রকৃতির বাইরে নয়। কৃষি, খাদ্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে দীর্ঘস্থায়ী সমৃদ্ধি অর্জন করা যায় না। অতএব, লক্ষ্মী আরাধনার সঙ্গে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্বকেও যুক্ত করে দেখা যায়।কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার আয়োজন অঞ্চলভেদে ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। কোথাও ধানভর্তি বেতের আড়িতে লক্ষ্মীর প্রতীক স্থাপন করা হয়, কোথাও মাটির সরা বা পটচিত্রে আঁকা দেবীমূর্তির পূজা করা হয়। ঢাকাই, ফরিদপুরি, সুরেশ্বরী ও শান্তিপুরি সরার মতো আঞ্চলিক শিল্পরীতিতে লক্ষ্মীসহ বিভিন্ন দেবদেবীর ছবি আঁকা হয়। এসব সরা কেবল পূজার উপকরণ নয়, বাংলার লোকশিল্প ও ঐতিহ্যেরও পরিচয় বহন করে।কিছু অঞ্চলে কলাগাছের খোল দিয়ে তৈরি সপ্ততরী লক্ষ্মী আরাধনার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। বাণিজ্যিক নৌকার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই সপ্ততরীতে টাকা, ধান, হলুদ, হরিতকি ও কড়ি রাখার রীতি রয়েছে। এসব উপকরণে ধনসম্পদ, কৃষি, বাণিজ্য ও সংসারের মঙ্গল কামনার প্রকাশ ঘটে।লক্ষ্মীপূজার আলপনায় ধানের ছড়া, মুদ্রা ও পায়ের ছাপ আঁকার পাশাপাশি বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার করা, পূজার স্থান সাজানো এবং সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালানোর রীতিও প্রচলিত। বাংলার এই আচারগুলো বহু পরিবারের স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আধুনিকতার পরিবর্তনের মধ্যেও এসব ঐতিহ্য টিকে থাকা সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার পরিচায়ক।কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা সাধারণত ঘরোয়া পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে পূজার প্রস্তুতি নেন। কেউ আলপনা আঁকেন, কেউ ফুল ও পূজার উপকরণ সাজান, কেউ ভোগ রান্না করেন। কোথাও উপবাসের রীতি রয়েছে, কোথাও পরিবারের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে পূজা করা হয়।ভোগের আয়োজনে অঞ্চল ও পারিবারিক রীতিভেদে খিচুড়ি, লুচি, পায়েস, ফলমূল, নারকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু ও নানা ধরনের মিষ্টি থাকে। কোথাও নিরামিষ খাবারের প্রচলন, আবার কোথাও স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির প্রভাব দেখা যায়। এসব আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ভক্তিভরে দেবীর উদ্দেশে নিবেদন এবং পরিবারের সবার মধ্যে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।এই পূজার একটি বড় দিক হলো পারিবারিক বন্ধন। ব্যস্ত জীবনে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে বসার সুযোগ কমে যাচ্ছে। উৎসব সেই দূরত্ব কমাতে পারে। বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে ছোটরা পূজার রীতি শেখে, পুরোনো দিনের গল্প শোনে, পরিবারের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়। এভাবেই ধর্মীয় আচার পারিবারিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার বাহক হয়ে ওঠে।লক্ষ্মীকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলা হলেও সৌভাগ্যের অর্থ কেবল টাকা-পয়সা, সোনা-গয়না কিংবা বিলাসী জীবন নয়। একটি পরিবারের সুস্থতা, শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৎ উপার্জন ও নিরাপদ জীবনও সমৃদ্ধির অংশ। মানুষের হাতে অর্থ থাকতে পারে, অথচ সংসারে শান্তি না-ও থাকতে পারে। আবার সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ভালোবাসা, সহযোগিতা ও মানবিকতার চর্চায় একটি পরিবার সুখী হতে পারে।সমাজের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। জাতীয় আয় বাড়লেই সব মানুষের জীবনমান উন্নত হয় না। সম্পদ যদি অল্প কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, আর বিপুলসংখ্যক মানুষ নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খান, তাহলে সেই সমৃদ্ধি সবার জন্য সমান অর্থ বহন করে না। তাই লক্ষ্মীপূজার ভাবনা আমাদের সম্পদের পাশাপাশি তার ন্যায্য ব্যবহার ও সামাজিক দায়িত্ব নিয়েও ভাবতে শেখাতে পারে।যে ঘরে অন্নের অভাব নেই, সেই ঘর থেকে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাবার এগিয়ে দেওয়া; যে মানুষের সামর্থ্য আছে, তাঁর অসহায় প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো; সৎ পথে উপার্জন করা এবং অন্যের অধিকার নষ্ট না করা—এসবই মানবিক সমৃদ্ধির পরিচয়। ধর্মীয় আচার তখনই জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়, যখন তা মানুষের আচরণে ভালো পরিবর্তন আনে।দুর্গাপূজা আমাদের কাছে অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়, শক্তির আরাধনা ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আসে। আর কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা মনে করিয়ে দেয় অন্ন, সম্পদ, শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা। দুই উৎসবের রূপ আলাদা হলেও মানুষের কল্যাণ কামনার জায়গায় তাদের মিল রয়েছে।তাই লক্ষ্মীপূজার আয়োজন শুধু বাহ্যিক আড়ম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকুক। পূজার আনন্দের পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, খাদ্য অপচয় বন্ধ করা এবং কৃষকের শ্রমের মর্যাদা রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বের যোগ তৈরি হবে।কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ যখন বাংলার আকাশ আলোকিত করে, তখন ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠে প্রদীপ। সেই আলো আমাদের মনে করিয়ে দিক, প্রকৃত সৌভাগ্য শুধু ব্যক্তিগত সম্পদে নয়; মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, শান্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যেও নিহিত। দেবী লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা—প্রতিটি ঘরে থাকুক অন্ন, প্রতিটি পরিবারে আসুক শান্তি, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ পান তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য, আর সমাজ থেকে দূর হোক অভাব, বঞ্চনা ও বৈষম্য।কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা হয়ে উঠুক সৌভাগ্যের আরাধনার পাশাপাশি সৎ জীবন, মানবিকতা ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয়।

— সচ্চিদানন্দ দে সদয়
আশাশুনি, সাতক্ষীরা

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024