‎শিল্পকারখানার ভারী পণ্যবাহী যান চলাচলে বছরজুড়েই বেহাল সড়ক,

‎মংলা–বাগেরহাট–খুলনা সড়কে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে হঠাৎ সংস্কার ও পরিচ্ছন্নতার তৎপরতা স্থানীয়দের নজর কেড়েছে। সড়কের বিভিন্ন অংশ ঝকঝকে-তকতকে করে তোলার এই উদ্যোগে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। তাঁদের প্রশ্ন, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি যদি অল্প সময়ের মধ্যে সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের দুর্ভোগ কমাতে সারা বছর এমন উদ্যোগ দেখা যায় না কেন?
‎
‎স্থানীয়দের অভিযোগ, মংলার বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে ভারী মালামাল নিয়ে ট্রাক ও অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলের কারণে সড়কটির ওপর সারা বছরই বাড়তি চাপ পড়ে। এর ফলে বিভিন্ন অংশে সড়কের অবস্থা বেহাল হয়ে পড়ে বলে তাঁরা জানান। কোথাও কোথাও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে, বাড়ে যাতায়াতের ভোগান্তি। বিশেষ করে প্রতিদিন এ পথে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রী, স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
‎
‎এলাকাবাসীর ভাষ্য, মংলা বন্দরের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পকারখানাগুলোর পণ্য পরিবহনের জন্য এই সড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারী যানবাহনের নিয়মিত চলাচল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও সড়কের ধারণক্ষমতা, নির্মাণমান ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। শুধু সড়ক নির্মাণ করলেই হবে না, অতিরিক্ত ভারের কারণে সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার এবং পণ্যবাহী যান চলাচলের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
‎
‎ভারী যানবাহনের চাপে সড়ক, ভোগান্তি সাধারণ মানুষের
‎
‎মংলার বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালামাল পরিবহনে ভারী ট্রাক ও অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ভারী যানবাহনের চাপ সামাল দেওয়ার উপযোগী অবকাঠামো, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় তদারকি না থাকলে সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
‎
‎স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে সাধারণ মানুষকে প্রায় সারা বছরই ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। যানবাহনের ধীরগতি, যাতায়াতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়কে চলাচলের ঝুঁকি তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তাঁরা।
‎
‎তাঁদের মতে, শিল্পকারখানার কার্যক্রম ও পণ্য পরিবহন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সড়ক সুরক্ষার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। সড়কের কোথায় বেশি ক্ষতি হচ্ছে, কোন ধরনের যানবাহনের চাপ বেশি পড়ছে এবং সংস্কারের পর সড়ক কত দিন টেকসই থাকছে—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার। প্রয়োজন হলে সড়কের উপযোগী নকশা, নির্মাণমান ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
‎
‎প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে হঠাৎ তৎপরতা
‎
‎প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সড়ক সংস্কার ও পরিচ্ছন্নতার তৎপরতা স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তাঁদের প্রশ্ন, বিশেষ সফর সামনে থাকলে দ্রুত সংস্কার ও পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হলেও বছরের অন্য সময়ে সড়কের দুরবস্থা দূর করতে একই রকম তৎপরতা কেন দেখা যায় না?
‎
‎স্থানীয়দের মতে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সফর উপলক্ষে সড়ক সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই উদ্যোগের সুফল যেন সাধারণ মানুষও দীর্ঘমেয়াদে ভোগ করতে পারেন। সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো নিয়মিত চিহ্নিত করে সংস্কার করা হলে এবং ভারী যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে বারবার একই ধরনের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি কমানো সম্ভব।
‎
‎তাঁরা আরও মনে করেন, সড়ক সংস্কার যেন কেবল দৃশ্যমান সৌন্দর্য বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সংস্কারকাজের স্থায়িত্ব, উপকরণের মান এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। সাময়িকভাবে সড়ক মসৃণ করে তোলার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
‎
‎শিল্পকারখানার দায় ও সরকারি তদারকি নিয়ে প্রত্যাশা
‎
‎মংলার শিল্পকারখানা ও বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য পরিবহনের গুরুত্ব বিবেচনায় সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। ভারী যানবাহনের চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, যানবাহনের অনুমোদিত ওজন নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা থাকলে জনদুর্ভোগ কমতে পারে।
‎
‎তবে সড়কের বর্তমান বেহাল অবস্থার জন্য ভারী যানবাহনই একমাত্র কারণ কি না, তা নিশ্চিত করতে সড়কের প্রকৃত অবস্থা, যানবাহনের ওজন, নির্মাণমান ও রক্ষণাবেক্ষণের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
‎
‎স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সড়কের সংস্কারকাজের ব্যয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, কাজের পরিধি ও সময়সীমা সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি শিল্পকারখানার পণ্য পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখার সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
‎
‎সাময়িক চাকচিক্য নয়, চান স্থায়ী সমাধান
‎
‎মংলা–বাগেরহাট–খুলনা সড়ক এ অঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সড়কটির উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ শুধু বিশেষ সফরকেন্দ্রিক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। স্থানীয়দের মতে, ভারী পণ্যবাহী যান চলাচলের চাপ বিবেচনায় নিয়ে সারা বছর সড়কটির মান বজায় রাখা প্রয়োজন।
‎
‎প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সড়কটি ঝকঝকে-তকতকে করে তোলার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সফর শেষ হওয়ার পরও যেন সড়কের এই অবস্থা বজায় থাকে। শিল্পকারখানার ভারী যানবাহনের চাপ মোকাবিলা, নিয়মিত সংস্কার, কার্যকর তদারকি এবং জনদুর্ভোগ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে তবেই এই পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জন্য স্থায়ী সুফল বয়ে আনবে।
‎
‎স্থানীয়দের মূল দাবি—প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সড়ক যেমন সংস্কার করা হচ্ছে, তেমনি বছরের বাকি সময়েও যেন তা চলাচলের উপযোগী থাকে। শিল্পকারখানার পণ্য পরিবহন ও সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত—দুটির মধ্যে ভারসাম্য রেখেই সড়কের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।

‎
প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024