|
Date: 2026-10-20 13:56:34 |
দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুরের পরাজয় ঘটে পুরাণের কাহিনিতে। অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির বিজয়ের সেই আখ্যান নিয়েই প্রতিবছর আসে শারদীয় দুর্গোৎসব। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, আরতির আলো আর ভক্তদের প্রার্থনায় মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। কিন্তু পাঁচ দিনের আনন্দ শেষে বিজয়া দশমীতে যখন প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন চলে, তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসে—দেবীর কাছে আমাদের চাওয়া কতটা পূরণ হলো, আর সমাজের জন্য আমাদের নিজেদেরই বা কী দেওয়ার আছে?বিজয়া দশমী একদিকে বিদায়ের বিষাদ, অন্যদিকে বিজয়ের আনন্দ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে দেবী দুর্গা সন্তানদের নিয়ে পিতৃগৃহে আসেন। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর পূজা শেষে দশমীতে তাঁর কৈলাসে প্রত্যাবর্তন। তাই প্রতিমা বিসর্জনের মুহূর্তে ভক্তদের মনে বিষাদ জাগে। ‘আসছে বছর আবার হবে’—এই উচ্চারণে প্রকাশ পায় আগামী দুর্গোৎসবের অপেক্ষা। কিন্তু উৎসবের এই আবেগের পাশাপাশি বিজয়া দশমী আমাদের সামনে তুলে ধরে আত্ম সমালোচনা ও আত্মশু দ্ধির সুযোগ।পুরাণের বর্ণনায়, মহিষাসুরের অত্যাচার থেকে দেবতাদের রক্ষা করতে দেবী দুর্গার আবির্ভাব। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর মহিষাসুরের পরাজয় ঘটে। এই কাহিনি শুধু একটি পৌরাণিক যুদ্ধের বিবরণ নয়; অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ন্যায় ও শুভ শক্তির সংগ্রামের প্রতীক হিসেবেও এর ব্যাখ্যা করা হয়। রামায়ণের কাহিনিতে রাবণের বিরুদ্ধে রামের বিজয়ও একই ধরনের নৈতিক বার্তা বহন করে। যুগে যুগে এসব আখ্যান মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রেরণা দিয়েছে।কিন্তু প্রশ্ন হলো, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এই বিজয়ের শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিজীবন ও সমাজ জীবনে কতটা কার্যকর হচ্ছে? পূজামণ্ডপে অসুরবধের দৃশ্য দেখে আমরা আনন্দিত হই, দেবীর কাছে শান্তি ও কল্যাণ কামনা করি। অথচ বাস্তব জীবনে দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ক্ষমতার অপব্যবহার আমাদের সমাজকে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দুর্বলের অধিকার হরণ হচ্ছে, অন্যায়ের শিকার মানুষ ন্যায়বিচার পেতে হিমশিম খাচ্ছে। এসব অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে বিজয়ার শিক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হবে?আমাদের চাওয়া হোক ন্যায় ও সমতা। এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ তার ধর্মীয় পরিচয়, আর্থিক অবস্থা কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে বৈষম্যের শিকার হবে না। নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে, শিশুরা নিরাপদে বেড়ে উঠবে, দরিদ্র মানুষ শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ পাবে এবং শ্রমজীবী মানুষ তার কাজের ন্যায্য মূল্য পাবে। ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষও সেই আনন্দের অংশীদার হতে পারবেন।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও এর আনন্দ বহু ক্ষেত্রেই সম্প্রদায়ের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের শুভেচ্ছা বিনিময়, পারস্পরিক সহযোগিতা ও একসঙ্গে উৎসবে অংশ নেওয়া সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে। এই সম্প্রীতি যেন কেবল উৎসবের কয়েকটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রত্যেক মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, জানমালের নিরাপত্তা ও সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা।একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সম্প্রীতি মানে শুধু পাশাপাশি বসবাস নয়; একে অন্যের অধিকার ও মর্যাদাকে স্বীকার করাও সম্প্রীতির শর্ত। প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের শিকার মানুষের পরিচয় না দেখে তার ন্যায্য অধিকারের পক্ষে কথা বলা এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদ করা—এসবের মধ্য দিয়েই সম্প্রীতি বাস্তব রূপ পায়। কোনো মানুষের প্রতি অবিচার হলে নীরব থাকা মানে সেই অবিচারকে প্রশ্রয় দেওয়া।দুর্গাপূজার আরেকটি বড় শিক্ষা নারীর শক্তি ও মর্যাদা। দেবী দুর্গাকে শক্তিরূপে আরাধনা করা হয়। অথচ বাস্তবে নারীরা যখন সহিংসতা, অবমাননা ও অধিকারহীনতার শিকার হন, তখন দেবী বন্দনার সঙ্গে আমাদের সামাজিক আচরণের বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নারীকে সম্মান করা, তাঁর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমান সুযোগ দেওয়ার মধ্য দিয়েই শক্তির আরাধনা অর্থবহ হতে পারে।বিজয়া দশমীতে আমাদের পাওয়ার হিসাবও কম নয়। উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষ আনন্দ পায়, পরিবার ও বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে মিলিত হয়, পুরোনো সম্পর্ক নতুন করে ঝালিয়ে নেয়। পূজামণ্ডপে মানুষের সমাগম, শিল্পীদের সৃজনশীলতা, স্বেচ্ছাসেবীদের পরিশ্রম এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ সামাজিক জীবনে প্রাণ সঞ্চার করে। কিন্তু এই প্রাপ্তির পাশাপাশি দায়িত্বও রয়েছে। উৎসবের আনন্দ যেন অন্যের অসুবিধার কারণ না হয়, পরিবেশ যেন দূষিত না হয় এবং বিসর্জনের সময় নদী-জলাশয় যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু অন্যায়, হিংসা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটে না। বরং উৎসব শেষে দৈনন্দিন জীবনে ফিরে গিয়ে আমরা কীভাবে আচরণ করছি, অন্যের অধিকার রক্ষায় কতটা সচেতন হচ্ছি, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কতটা সোচ্চার হচ্ছি—সেখানেই বিজয়ার প্রকৃত পরীক্ষা।আমাদের চাওয়া শুধু শান্তি নয়, ন্যায়ভিত্তিক শান্তি; শুধু সম্প্রীতি নয়, সমান অধিকার ভিত্তিক সম্প্রীতি; শুধু উন্নয়ন নয়, বৈষম্য কমিয়ে সবার জীবনে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়া। আমাদের পাওয়া যেন কেবল উৎসবের আনন্দে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার চর্চায় প্রসারিত হয়।দেবীর বিসর্জনের সময় প্রচলিত মন্ত্রে তাঁকে আবার ফিরে আসার প্রার্থনা জানানো হয়—
"গচ্ছ গচ্ছ পরম স্থানং স্বস্থানম পরমেশ্বরী।
যৎ পূজিতং ময়া দেবী পরিপূর্ণং তদস্তুমে।।
গচ্ছ গচ্ছ পরম স্থানং যত্র দেব মহেশ্বরঃ।
সমবৎসরব্যতিতেতু পুনরাগমনায় চ।।"
হে পরমেশ্বরী দেবী, আপনি নিজ স্থানে পরম ধামে গমন করুন। আমরা যে আপনার পূজা করলাম, তা যেন আপনার কৃপায় পূর্ণতা লাভ করে। আপনি সেই পরম স্থানে গমন করুন যেখানে মহেশ্বর (শিব) বিরাজ করেন, এবং এক বছর অতিক্রান্ত হলে আবার যেন আপনার আগমন ঘটে।দেবীর বিদায় বেলায় তাই আমাদের প্রত্যাশা—মানুষের মন থেকে হিংসা ও বিদ্বেষ দূর হোক, সমাজ থেকে অন্যায় ও বৈষম্য কমুক, নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক এবং সব ধর্মের মানুষ নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকুক। আমরা যেন অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করি, দুর্বলের অধিকার হরণ না করি এবং নিজের স্বার্থে মানবিক মূল্যবোধ বিসর্জন না দিই।বিজয়া দশমীর সার্থকতা শুধু দেবীর বিজয় স্মরণে নয়, সেই বিজয়ের শিক্ষা জীবনে ধারণ করার মধ্যে। প্রতিমা বিসর্জন হবে, উৎসব শেষ হবে; কিন্তু ন্যায়, মানবতা ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় যেন বিসর্জন না হয়। এটাই হোক বিজয়া দশমীতে আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া, আর মানুষের জন্য কাজ করাই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।(লেখক-সংবাদকর্মী)
© Deshchitro 2024