সচ্চিদানন্দ দে সদয়


দুর্গোৎসবের শেষ প্রহরে এসে মহানবমী আমাদের সামনে হাজির করে আনন্দ ও বিষাদের এক মিশ্র অনুভূতি। শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের দোলা, শিউলির সুবাস আর ঢাকের শব্দে যে উৎসবের সূচনা, নবমীতে এসে তার বিদায়বেলার সুর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর মাত্র এক দিন পরেই বিজয়া দশমী। দেবী দুর্গা ফিরে যাবেন কৈলাসে, আর ভক্তরা ফিরে যাবেন দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায়। কিন্তু মহানবমীর তাৎপর্য কি শুধু দেবীর বিদায়ঘন মুহূর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ? নিশ্চয়ই নয়। মহানবমী শক্তির আরাধনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং মানুষের ভেতরের শুভবোধ জাগিয়ে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে এর আবেদন পূজার মণ্ডপ কিংবা ধর্মীয় আচারের গণ্ডিতে আটকে নেই। এই উৎসব মানুষকে কাছাকাছি আনে, আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করে এবং সামাজিক সম্প্রীতির সুযোগ তৈরি করে। ষষ্ঠীর বোধন থেকে সপ্তমী ও অষ্টমী পেরিয়ে নবমীতে এসে উৎসবের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয় আত্মসমীক্ষার আহ্বান। দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রশ্ন জাগে—দেবীর আরাধনায় যে শক্তি, সাহস ও ন্যায়ের কথা বলা হয়, বাস্তব জীবনে তার কতটা প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছি আমরা?পুরাণের কাহিনি ও নবমীর তাৎপর্য হিন্দু পুরাণে দেবী দুর্গার মহিষাসুরবধের কাহিনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। দেবতাদের সম্মিলিত শক্তিতে আবির্ভূত দেবী মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে পরাজিত করেন। এই কাহিনির মূল শিক্ষা হলো, অন্যায় ও অত্যাচার যত শক্তিশালীই হোক, তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।রামায়ণের প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় লাভের জন্য শ্রীরাম শরৎকালে দেবী দুর্গার অকালবোধন ও পূজা করেছিলেন। প্রচলিত বিশ্বাসে, ১০৮টি নীলপদ্ম নিবেদনের ঘটনাও এই উপাখ্যানের সঙ্গে যুক্ত। এই পূজা অকালবোধন নামে পরিচিত। তবে দুর্গাপূজার আচার ও তিথি বিভিন্ন শাস্ত্রীয় পরম্পরায় ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাই নবমীর তাৎপর্য বুঝতে হলে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত নৈতিক শিক্ষার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।মহানবমী দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান তিথি। এদিন দেবীর বিহিত পূজা, মন্ত্রোচ্চারণ, পুষ্পাঞ্জলি ও হোম-যজ্ঞের মাধ্যমে ভক্তরা তাঁর কাছে মঙ্গল, শান্তি ও কল্যাণ কামনা করেন। অঞ্চল ও পূজাপদ্ধতি অনুযায়ী আচার-অনুষ্ঠানে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। এসব আচার ভক্তির প্রকাশ হলেও পূজার প্রকৃত শিক্ষা নিহিত রয়েছে মানুষের চিন্তা ও আচরণের পরিবর্তনে।মহানবমীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক তাৎপর্য হলো নারীশক্তির স্বীকৃতি। দেবী দুর্গাকে শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। তিনি অসুরবিনাশিনী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক। কিন্তু যে সমাজে দেবীকে শক্তিরূপে পূজা করা হয়, সেই সমাজেই যখন নারী নির্যাতন, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি ও বৈষম্যের ঘটনা ঘটে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আমাদের আরাধনার সঙ্গে বাস্তব জীবনের এত ব্যবধান কেন?নারীকে দেবী বলে সম্বোধন করলেই তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রয়োজন পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তাঁর সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা। নারীর শিক্ষা, নিরাপত্তা, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নারীকে কেবল পূজার প্রতীক হিসেবে দেখলে চলবে না; মানুষ হিসেবে তাঁর অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সম্মান করতে হবে।মহানবমীর শক্তির বার্তা তখনই অর্থবহ হবে, যখন নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কার্যকর ভূমিকা নেবে। মণ্ডপে দেবীর সামনে প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাহসও জ্বালাতে হবে। কারণ শক্তির আরাধনা আর শক্তির বাস্তব প্রয়োগ এক বিষয় নয়।মহিষাসুরকে পরাজিত করার কাহিনি কেবল পৌরাণিক যুদ্ধের বিবরণ নয়; এর একটি নৈতিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। মানুষের ভেতরে লোভ, হিংসা, অহংকার, অসহিষ্ণুতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার অশুভ প্রবণতা হিসেবে কাজ করে। সমাজে দুর্নীতি, প্রতারণা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও দুর্বলের ওপর নির্যাতনও সেই অশুভেরই প্রকাশ।দেবী দুর্গার হাতে অস্ত্র থাকার তাৎপর্য এখানেই—অন্যায়ের সামনে নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো মহৎ গুণ নয়। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে তা আরও শক্তিশালী হয়। পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবনে অনিয়ম ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অবস্থান নিতে হবে। ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে অন্যায়কে মেনে নেওয়া এবং নিজের সুবিধার জন্য নীতির সঙ্গে আপস করা বন্ধ করতে না পারলে অসুরবধের প্রতীকী শিক্ষা পূর্ণতা পাবে না।তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মানে প্রতিহিংসা নয়। এর অর্থ সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা। মহানবমীর শিক্ষা প্রতিশোধের নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার।বাংলাদেশের সামাজিক জীবনে দুর্গোৎসবের একটি স্বতন্ত্র স্থান রয়েছে। গ্রাম থেকে শহর, ছোট পূজামণ্ডপ থেকে বড় আয়োজন—সর্বত্র এই উৎসবকে ঘিরে মানুষের মিলন ঘটে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে উৎসবের পরিসর বিস্তৃত হয়।সাতক্ষীরার আশাশুনিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপেও দুর্গোৎসবকে ঘিরে তৈরি হয় আনন্দের পরিবেশ। স্থানীয় মানুষ পূজার আয়োজন, মণ্ডপের নিরাপত্তা ও দর্শনার্থীদের সহযোগিতায় ভূমিকা রাখেন। তবে সম্প্রীতির প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল উৎসবের কয়েক দিনের সৌহার্দ্য দিয়ে করা যায় না। সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্পত্তির অধিকার এবং নির্ভয়ে জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিয়েই সম্প্রীতির বাস্তব চিত্র বোঝা যায়।দুর্গাপূজার সময় শুভেচ্ছা বিনিময় যেমন প্রয়োজন, তেমনি সারা বছর প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করাও জরুরি। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ যেন অবহেলা, বৈষম্য কিংবা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। একইভাবে সব ধর্মের মানুষেরও উচিত পরস্পরের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানো এবং বিভেদ সৃষ্টিকারী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা।ধর্মীয় উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন তার আনন্দ অন্য মানুষের জন্যও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হয়ে ওঠে। সম্প্রীতি কোনো আনুষ্ঠানিক স্লোগান নয়; এটি ন্যায়, সমান অধিকার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা।মহানবমীর আবেগের আরেকটি দিক হলো বিদায়ের অনুভূতি। সারা বছরের অপেক্ষার পর পাঁচ দিনের উৎসব যেন মুহূর্তেই শেষ হয়ে আসে। মণ্ডপের আলো, ঢাকের বাদ্য, ধুনুচি নাচ, অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো সময় মানুষের মনে স্মৃতি হয়ে থাকে। নবমীর সন্ধ্যায় সেই আনন্দের মধ্যেই জন্ম নেয় বিচ্ছেদের বেদনা।দেবীর বিদায় আমাদের জীবনের একটি সাধারণ সত্যও মনে করিয়ে দেয়—কোনো আনন্দ চিরস্থায়ী নয়, কোনো প্রাপ্তিই স্থায়ীভাবে ধরে রাখা যায় না। কিন্তু বিদায় মানেই সবকিছুর সমাপ্তি নয়। উৎসব শেষ হলেও তার শিক্ষা, স্মৃতি ও প্রেরণা মানুষের সঙ্গে থেকে যেতে পারে। তাই দেবীকে বিদায় জানানোর আগে নিজের জীবন ও সমাজের দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন।আগামীকাল বিজয়া দশমীতে দেবীর বিসর্জন হবে। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু বিসর্জনের অর্থ যদি কেবল প্রতিমাকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পূজার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মানুষের ভেতরের হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও অন্যায় প্রবণতাকে বিসর্জন দেওয়ার সংকল্পও নিতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর একই আচার ফিরে আসবে, অথচ সমাজের অসংগতি থেকে যাবে আগের মতোই।আজ মহানবমী। ভক্তরা দেবীর চরণে পুষ্প নিবেদন করবেন, প্রার্থনা করবেন পরিবার ও সমাজের মঙ্গল কামনায়। সেই প্রার্থনার সঙ্গে যুক্ত হোক আরও একটি অঙ্গীকার—অন্যায়ের প্রতিবাদ করব, নারীকে মর্যাদা দেব, দুর্বলের পাশে দাঁড়াব এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের অধিকারকে সম্মান করব।দেবী দুর্গার আরাধনার প্রকৃত সার্থকতা কেবল মণ্ডপের আলোয় নয়, মানুষের বিবেকের জাগরণে। মহিষাসুরবধের কাহিনি তখনই জীবন্ত হয়ে উঠবে, যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হবে।মহানবমী তাই বিদায়ের বেদনার পাশাপাশি আত্মশুদ্ধি ও নতুন শপথের দিন। দেবী ফিরে যাবেন, উৎসব শেষ হবে, ঢাকের শব্দ থেমে যাবে। কিন্তু শক্তির আরাধনা যেন থেমে না যায়। কারণ যে সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখে, নারীর মর্যাদা রক্ষা করে এবং সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে চায়, সেই সমাজেই শুভ শক্তির প্রকৃত বিজয় সম্ভব।

(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024