সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে মব সৃষ্টি করে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ১১টার দিকে পার্শ্ববর্তী কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দেবহাটা সার্কেল, কালিগঞ্জ থানা ও দেবহাটা থানা পুলিশের পাশাপাশি এসআরবি-৬-এর যৌথ অভিযানে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পলাতক এই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিহত শামীমের পরিবারের দায়ের করা মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।

ঘটনা সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ অক্টোবর দেবহাটায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান। নিহত শামীম (৩৮) দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামছুর রহমান সানার ছেলে।

অভিযোগ রয়েছে, কথিত ধর্ম অবমাননার বিষয়কে কেন্দ্র করে ফজলুল হক আমিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি উসকানিমূলক লাইভ প্রচার করেন। পরবর্তীতে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা স্থানীয় সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও উসকে দিয়ে ঘটনাস্থলে জড়ো করেন। একপর্যায়ে সেখানে মব সৃষ্টি করে শামীমকে জনসম্মুখে মারধর করা হয়। এতে তাঁর মৃত্যু হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা, ক্ষোভ ও নিন্দার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের মতে, ধর্মীয় অনুভূতির মতো সংবেদনশীল বিষয়কে কেন্দ্র করে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আদালতের। ধর্মীয় উসকানি দিয়ে জনতাকে সংঘবদ্ধ করে সহিংসতা সৃষ্টি করা হলে তা সমাজে অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে।

নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।

এদিকে, নিহতের ভাই আব্দুল জলিল বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় দেবহাটার পারুলিয়া এলাকার ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করা হয়।

মামলা দায়েরের পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে এজাহারনামীয় ৫ম ও ৬ষ্ঠ আসামিকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে শনিবার রাতে প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়। এ ঘটনায় অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচএম শাহীন জানান, দেবহাটা সার্কেল, কালিগঞ্জ থানা ও দেবহাটা থানা এবং এসআরবি-৬-এর যৌথ অভিযানে ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তার আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া নেওয়া হবে। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, ধর্মীয় উসকানি দিয়ে সহিংসতা সৃষ্টি করা এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনায় প্রধান আসামি গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তদন্তে নতুন অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024