জামালপুরের বকশীগঞ্জে সরকারের গৃহীত কাজের বিনিময়ে খাদ্যশস্য (কাবিখা) প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস পর দুইটি প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়েছে।  


তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজ সম্পন্ন না করেই কাজ বন্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের বরাদ্দ কত, সভাপতিকে, কাজ কবে শেষ হবে; এই ধরনের তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড প্রকল্প এলাকায় সাঁটিয়ে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, সেটা দেওয়া হয়নি। যার ফলে কবে নাগাদ কাজ শেষ করা হবে; তা নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, দায় এড়ানোর জন্য কয়েকদিন আগে আবারও রাস্তায় নামমাত্র মাটি ফেলা হয়েছে। তবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) দাবি, দায় এড়াতে নয়। বরং 'চমৎকার কাজ হয়েছে'। 


জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক জামালপুর-১ (বকশীগঞ্জ-দেওয়ানগঞ্জ) আসেনের এমপি, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের কোটায় গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারের জন্য কাজের কাবিখা কর্মসূচির আওতায় তিন দফায় এ উপজেলায় ৪৬ মেট্রিক টন ২০০ কেজি গম বরাদ্দ অনুমোদন হয়। এতে সাতটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া দুই দফায় ৩৪ টন ২০০ কেজি চাল বরাদ্দ আসে। এতে পাঁচটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। গত জুন মাসের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে জেলা থেকে প্রকল্পগুলো অনুমোদন হয়। এরপর কাজ শুরু করতে প্রকল্পের সভাপতিদের স্বাক্ষরে বরাদ্দের চাল-গম খাদ্য গুদাম থেকে উত্তোলন করা হয়েছে। গত ৩০ জুন প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ায় কাগজ-কলমে কাজ শতভাগ বাস্তবায়ন দেখিয়েছেন পিআইও।  


অভিযোগ উঠে, সিংহভাগ প্রকল্পের সভাপতি প্রকল্প বিষয়ে অবগত নন। পিআইও কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে ভুয়া মাস্টারোল তৈরিসহ প্রকল্প বাস্তবায়নে কাগুজে কমিটির মাধ্যমে  উন্নয়নের নামে লুটপাটের স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলে সরকারি বরাদ্দের চাল-গম আত্মসাত করা হয়েছে। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস পরও কাজ শুরু না হওয়ায় এর দায় পিআইও এড়াতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেছেন স্থানীয়রা।


সরেজমিনে দেখা গেছে, উজান খেওয়ারচর ইকবালের বাড়ি থেকে হযরত আলীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ছয় টন গম বরাদ্দ দিলেও রাস্তাটির উত্তর পাশে নামমাত্র মাটি দেওয়া হয়েছে। 


ঘুগরাকান্দি মুন্দিপাড়া ব্রিজসংলগ্ন গোলাপের দোকান থেকে ঘুগরাকান্দি বাজার পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে নয় টন চাল বরাদ্দের এ রাস্তার একাংশে মাহিন্দ্র গাড়ি দিয়ে নামমাত্র মাটি ফেলানো হয়। 


ঘুগরাকান্দি হযরত আলীর বাড়ি থেকে আবুল খায়ের মাস্টারের বাড়ি মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে সাত টন গম এবং পূর্ব কলকিহারা নালুর দোকান থেকে বাঘাডোবা ধলা মাস্টারের বাড়ির হয়ে ফকিরপাড়া শান্তিনগর বাজার পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ছয় টন ২০০ কেজি গম বরাদ্দ আসে। এই রাস্তা দুইটিতে তেমন কোনো কাজ দেখা যায়নি।


বাঘাডোবা মাদ্রাসা থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার ১০ টন গম বরাদ্দ আসে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউই প্রকল্পটির স্থান চিহ্নিত করতে পারেননি। 

পূর্ব কলকিহারা পুরমালের বাড়ি থেকে ফুরু মিয়ার বাড়ি হয়ে বৃগদারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে পাঁচ টন চাল এবং মেরুরচর সাইফুল ইসলামের বাড়ি থেকে রশিদের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত প্রকল্পে পাঁচ টন ২০০ কেজি গম বরাদ্দ আসে। এসব প্রকল্পের সভাপতিরা রাস্তায় মাটি কাটার বিষয়ে তেমন কিছু বলতে পারেন না।


এনিয়ে অতিসম্প্রতি গণমাধ্যম 'কাজ না করেই কাবিখা প্রকল্প শতভাগ বাস্তবায়ন, পিআইও বললেন, ‘আমি সৎ’ শিরোনামে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্টরা। এক পর্যায়ে গত ৩ অক্টোবর খেওয়ারচর বাবুর বাড়ি থেকে বাতেনের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার এবং খোকনের বাড়ি থেকে বাতেনের বাড়ি পর্যন্ত ছয় টন করে মোট ১২ টন গম বরাদ্দের এই রাস্তা দুইটি সংস্কারে মাটি কাটার কাজ শুরু করা হয়। কাজ সম্পন্ন না করেই বর্তমানে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। 


স্থানীয় বাসিন্দা বাবু বলেন, 'আমার বাড়ি থেকে রাস্তা শুরু হয়েছে। কয়েকদিন আগে ১০-১২ জন শ্রমিক এসে রাস্তায় মাটি কেটেছে। বর্তমানে কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে ভাঙা চোরা রাস্তা আগের রূপই রয়েছে।'


বকশীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুরাদ হোসেন বলেন, 'মাঠ পর্যাযে প্রকল্পের কাজ দেখভাল করা হয় পিআইওর কার্যালয় থেকে। এ ছাড়া আমি প্রকল্পের বিষয়ে পুরোপুরি জানি না। বিষয়টি পিআইও ভালো বলতে পারবে।'


উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব ও পিআইও মো. হাবীবুর রহমান সুমন বলেন, 'আনীত অভিযোগ ঠিক নয়। সবগুলো প্রকল্প শতভাগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে জমি জটিলতায় সময় মতো দুইটি প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায়নি। গত কয়েকদিন আগে ওই প্রকল্প দুইটিতে চমৎকার কাজ করা হয়েছে। আমি কাজের লোক। কাজ না করলে আমার ভালো লাগে। প্রয়োজনে আরও কাজ করা হবে।'






প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024