|
Date: 2026-10-05 18:17:46 |
◾নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার : আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের জাগরণের দিন বলা চলে। শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়ার দিন বার্তা হতে পারে এ দিবসে। তাই অন্যান্য দেশের সাথে তাল রেখে আমাদের দেশেও পালিত হচ্ছে শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের অবদানকে সম্মান জানানো এবং তাদের অধিকার ও মর্যাদাকে তুলে ধরার জন্য প্রতি বছর এ দিবস পালন করা হয়ে থাকে। ইউনেস্কো এর ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৯৪ সাল থেকে ৫ অক্টোবর শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে।
এ দিবসে দেশের শিক্ষকদের মাঝে প্রাণের সঞ্চার হয় কিছুটা মর্যাদা ও অধিকার আদায় হবে বলে। কিন্তু আজকের এই দিনে এটা কেমনভাবে আদায় হচ্ছে বা আদৌ হচ্ছে কি না তাতে যথেষ্ট সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। শিক্ষক এবং শিক্ষা একটা অন্যের পরিপূরক এটা সবাই আমরা চিন্তা করি এবং বলি কিন্তু এ পর্যন্তই থেকে যায়। এটাও আমরা স্বীকার করি যে ভালো শিক্ষা অর্জনের জন্য প্রয়োজন ভালো শিক্ষক। প্রথমেই শিক্ষক ও পরে শিক্ষা নিয়ে কথা বলতে চাই। শিক্ষক হলেন সেই ব্যক্তি যিনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দেন ও সামনে যাওয়ার পথ দেখান এবং শিক্ষার্থীকে সঠিকভাবে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করেন। যে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাাকার স্বপ্ন যিনি দেখান সে হয় শিক্ষার্থীর নিকট একজন আদর্শ মানুষ। যে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা পরিবারিকভাবে যিনি শিক্ষাদানের মহান সেবায় নিয়োজিত থাকেন তাদের শিক্ষক বলি আমরা।
শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন কিছু শেখানো, নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা এবং তাদের মধ্যে যে প্রতিভা রয়েছে সুপ্তভাবে তাকে বিকশিত করানোর দায়িত্ব হচ্ছে শিক্ষকের। শিক্ষকের স্তর হতে পারে বিভিন্ন রকম। স্তর যাই হোক না কেন প্রতিটি শিক্ষকই শিক্ষার্থীর নিকট হবে স্বপ্ন দেখানোর কারিগর। শিক্ষকতাকে সবসময়ই আমরা পেশা হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি না। দেখা যায় শিক্ষকতার বিষয়টি অনেক সময়ই শিক্ষকদের কাছে নেশায় পরিণত হয়ে যায়। তবে এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক শব্দটি বেশির ভাগই পেশায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্তার এই যে বদলে যাওয়া ক্ষেত্রে কেবলমাত্র যে শিক্ষকরাই দায়ী তা কিন্তু বলা যাবে না।
এজন্য সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা যৌথভাবে দায়ী। শিক্ষক শব্দটির বাংলা অর্থের মধ্যে নিহিত রয়েছে শিষ্টাচার, ক্ষমাশীল ও কর্তব্যপরায়ণ। অন্যদিকে ইংরেজি অর্থের মধ্যে রয়েছে সত্যবাদী, শিক্ষিত, সক্রিয়, চরিত্রবান, সৎ, উদ্যোগী ও দায়িত্ববান। অনেক গুলো বিশেষণের সমষ্টি। এসব শব্দের অর্থ বুঝলে বুঝা যায় একজন মানুষ শিক্ষক হতে চাইলে তার কতগুলো বিশেষণ থাকতে হয়। শিক্ষক শব্দটি আদিকাল থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এবং শব্দটি এখন মানুষ সম্মানের চোখেই দেখে। শিশুকাল কাল থেকে বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের কাছে মানুষ শিক্ষা লাভ করে থাকে। তার বাইরেও মানুষ পারিবারিক ভাবে অতিরিক্ত শিক্ষা লাভের জন্য শিক্ষকের নিকট তার সন্তানকে সমর্পণ করে থাকে। এছাড়াও অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ম চর্চ্চার জন্যও বিভিন্ন স্তরে শিক্ষকের দারস্থ হন। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, বিশ^বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা বিভাগে বিভিন্ন স্তরের মানুষ শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন আবার সরকারী ও বেসরকারী।
কোন কোন পর্যায়ে এসব শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ থাকলেও সকল শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। আবার সকল ক্ষেত্রেই একই স্তরে শিক্ষকের মানও একরকম নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো আমাদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বুকফাটিয়ে বিভিন্ন সময় শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা বললেও বাস্তবে পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। পৃথিবীর সাথে তাল মিলাতে হলে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে হবে।
আর এই শিক্ষা ব্যবস্তার পরিবর্তন আনতে যারা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবেন তারা হচ্ছেন শিক্ষক। শিক্ষকতা এখন পেশায় রুপান্তর হয়ে যাচ্ছে এর প্রধান কারন হেলঅ এখাতে আমরা ভালো বিনিয়োগ আমরা করতে পারছি না। তাই আমরা লক্ষ্য করছি শিক্ষকতাটা এখনও আমাদের মেধাবীদের মাঝে অগ্রাধিকার হিসেবে তৈরি হচ্ছে না। ভালো মানের শিক্ষক নিয়োগ না পেলে বা আসতে না চাইলে ভালো শিক্ষাও আশা করা যায় না এবং ভালো শিক্ষা না হলে বালো জাতিও গঠন করা সম্ভব হবে না। সবচেয়ে মজার বিষয়ও হলো শিক্ষার খরচকে এখনও ব্যয় হিসেবেই আখ্যায়িত করছি । আমরা অনুধাবন করতে পারছি না যে এটি হচ্ছে শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় একেকটি ধাপে একেক রকম সম্যায় বিদ্যমান।
শিক্ষায় বিনিয়োগ যে যে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তাও বলা যাবে না। অনেক জায়গায় নৈতিকতার সংকটটি এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে যদি আমরা প্রশ্ন করি তোমরা কারা কারা শিক্ষক হতে চাও তাহলে মেধাবীদের হাত উঠবে না উঠবে কেবল ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ক্ষেত্রে। কিন্তু এই ডাক্তার ইঞ্জিয়ার কারা বানাবে সেটা চিন্তা করছি না । এই ক্ষেত্রে অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা সবচেয়ে বেশি। কাদের হাতে এ দায়িত্ব দেওয়া হবে এটাও চিন্তা করতে পারছি না। মানুষের ক্যারিয়ারের পছন্দের তালিকায় বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই শিক্ষক হওয়ার যে স্বপ্ন তার তালিকাটা একবারে নিচের স্তরে থাকে। এই পেশার চেয়ে মানুষ এখন অফিসার হতে চায় বেশি। মানুষ চায় অর্থ আর ক্ষমতা। শিক্ষকতা পেশায় ক্ষমতা শব্দটি নেই তবে রয়েছে মানুষের ভালোবাসা আর সম্মান পাওয়ার ক্ষমতা।
অন্যদিকে অর্থের ব্যাপারটাও বর্তমানে শিক্ষকতা পেশায় রয়েছে তবে সেটা গুটিকতক বিষয়ের উপর নির্ভর করে এবং তাও শহর কেন্দ্রিক বেশি। অতীত সময়ে মানুষের আর্থিক চাহিদা থাকলেও সম্মান অর্জনটা অনেক ক্ষেত্রেই মূখ্য হিসেবে বিবেচনা করত তাই অনেক মেধাবী মানুষরা এ পেশায় এসেছিল। মধ্য সময়টা একেবারেই বলা চলে শিক্ষা ব্যবস্থার দুঃসময় বলা চলে। যাদের কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়নি তারা চলে এসেছে শিক্ষকতা পেশায়। তবে বর্তমান ব্যবস্থায় অনেকটাই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে বলা চলে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে সম্প্রসারণের লক্ষে ব্যাপকভাবে যত্রতত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলা হয়েছে এবং মানহীনভাবে শিক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষা এবং শিক্ষক উভয় জায়গায় সংকট তৈরি হয়েছে।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যোগ্যতাকম মানুষকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। আমাদের দেশের যারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন তাদের সন্তানদেরকে শিক্ষক হিসেবে দেখতে চান কি না সে প্রশ্নের জরিপ করতে পারেন। সেখানে দেখবেন এই শিক্ষকতার প্রতি এজাতির আগামী কর্ণধারদের কত অনাগ্রহ। প্রচুর শিক্ষার্থী বিশ^বিদ্যালয় থেকে অধ্যায়ন করতে শিক্ষকতা পেশায় আসলেও সমমানের বা অন্যকোন নিচের গ্রেডে চাকুরির সুযোগ পেলেও চলে যাচ্ছে। তাহলে কিভাবে আশা করা যায় এ ব্যবস্থায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা এ ব্যবস্থার হাল ধরবে ? একারণে রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে যেন শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আগ্রহী হয়। সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে বর্তন প্রজন্মের শিক্ষকদের যেন তাদের হাত ধরেই আগামী প্রজন্মের মেধাবীরা এ জায়গায় আসে। সম্মান ও ভালোবাসার জায়গাটা তৈরি করে রেখে যেতে হবে আগামীতে দেশকে বাঁচানোর জন্য। মনে রাখতে হবে আমরা একটি অস্থির প্রজন্মের মধ্য দিয়ে বর্তমানে চলছি। এই প্রজন্ম যদি ভিন্ন পথে হারিয়ে যায় তাহলে সামনে আরো কঠিন বিপদের সম্মুখিন হতে হবে। কেবলমাত্র শিক্ষক দিবস করলেই হবে না। শিক্ষা এবং শিক্ষকদের কোন জায়গায় সমস্যা রয়েছে তা বের করতে হবে। এটাকে কোন রাজনৈতিক সমস্যায় ফেলা যাবে না। রাজনীতি থেকে একে বাইরে রাখতে হবে। সকলকে একযোগে শিক্ষা নেিয় চিন্তা করতে হবে বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে। আমরা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার জন্য দেশের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে কিন্তু তাতে কি লাভ হয় আমরা জানি না কারণ এর প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই না। তাই সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও শিক্ষা নিয়ে ভাবতে হবে।
লেখক : প্রভাষক, আলীনগর কারিগরি ও বাণিজ্যিক কলেজ, ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ।
© Deshchitro 2024