‎দীর্ঘ পাঁচ বছর ও আইনি লড়াইয়ের পর উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্মচারী সংঘের নির্বাচন, যেখানে সভাপতি পদে মোঃ সরোয়ার হোসেন খোকন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মোঃ সোবহান মোল্লা বিজয়ী হয়েছেন।


‎দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ট্রেড ইউনিয়ন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্মচারী সংঘের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। মোংলা বন্দর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত এই নির্বাচনে মোট ৭৭১ জন ভোটার অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন এবং দীর্ঘদিন পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিজের পছন্দমতো নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রাথমিক ঘোষণা অনুযায়ী, এই নির্বাচনে সভাপতি পদে আনারস প্রতীকের প্রার্থী মোঃ সরোয়ার হোসেন খোকন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে দোয়াতকলম প্রতীকের প্রার্থী মোঃ সোবহান মোল্লা বিজয়ী হয়েছেন এবং তাদের পুরো প্যানেলই বন্দর কর্মীদের নিরঙ্কুশ সমর্থন লাভ করেছে। ভোটগ্রহণ শুরুর আগে থেকেই কেন্দ্র ও এর আশপাশের এলাকায় ভোটারদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়, যা মূলত শ্রমিক ও কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চিত ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের আকাক্সক্ষাই ফুটিয়ে তুলেছে এবং কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।


‎এই নির্বাচনে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেল অংশগ্রহণ করায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বেশ জাস্টিফাইড ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, যেখানে এক পক্ষে নেতৃত্ব দেন বিজয়ী প্রার্থী সরোয়ার-সোবাহান পরিষদ এবং অপর পক্ষে সভাপতি প্রার্থী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী কাজী খুরশিদ আলম পল্টু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার আলোকেই মূলত এই নির্বাচনী আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও মোংলা পোর্ট পৌরসভার সাবেক মেয়র মোঃ জুলফিকার আলী সংবাদমাধ্যমকে স্পষ্ট করেছেন যে, বিগত সময়ে গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত করে যেভাবে রাতের আঁধারে বা কৃত্রিম উপায়ে নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া হতো, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বর্তমান বাস্তবতায় ব্যালট পেপারের মাধ্যমে সরাসরি ভোটগ্রহণের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিজয়ী প্রার্থীরা ছাড়াও কার্যকরী সভাপতি পদে ৪১১ ভোট পেয়ে মোটরসাইকেল প্রতীকের প্রার্থী, ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি পদে ৪২৩ ভোট পেয়ে কলস প্রতীকের প্রার্থী এবং সহ-সভাপতি পদে ৪৮১ ভোট পেয়ে কাতল মাছ প্রতীকের প্রার্থীসহ ২৫টি বিভিন্ন পদের বিপরীতে প্রার্থীরা প্রাথমিক ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন, যা ট্রেড ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন গতি এনেছে।


‎নির্বাচনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও ফলাফল প্রকাশের পর বন্দর কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দাবি-দাওয়া ও অধিকার আদায়ের বিষয়টি এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য পদধারীরা যেমন—সাংগঠনিক সম্পাদক পদে মোঃ নাজিমুদ্দিন হাওলাদার, অর্থ সম্পাদক পদে মোঃ নিজাম উদ্দিন রনি এবং বন্দর বিষয়ক সম্পাদক পদে রেকর্ড সংখ্যক ভোট পাওয়া মোঃ নিয়ামুল হক রাকি নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব কতটুকু নিষ্ঠার সাথে পালন করবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ভোটার ও সাধারণ কর্মচারীদের প্রত্যাশা, অতীতে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে যে টালবাহানা বা দলীয়করণের সংস্কৃতি চলেছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে এই নতুন নেতৃত্ব বন্দরের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের নায্য পাওনা নিশ্চিতকরণে কঠোর ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণার পর নিয়মতান্ত্রিক অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে খুব দ্রুতই নির্বাচিত পূর্ণাঙ্গ প্যানেলকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হবে, যা মোংলা বন্দরের সামগ্রিক প্রশাসনিক কার্যক্রমেও একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


‎পরিশেষে বলা যায়, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্মচারী সংঘের এই নির্বাচন কেবল একটি সাধারণ ট্রেড ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও ভোটাধিকার হরণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি সফল গণতান্ত্রিক প্রয়াস। বন্দরের সার্বিক কর্মপরিবেশ উন্নত করতে এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে এই নতুন নেতৃত্ব কতটা কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই নির্বাচনের প্রকৃত সার্থকতা। বন্দরের গতিশীলতা বজায় রাখতে এবং শ্রমিক ও প্রশাসনের মধ্যে একটি সুদৃঢ় ও আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে বিজয়ী প্যানেলকে এখন থেকেই সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হবে, যাতে সাধারণ কর্মচারীরা তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অধিকার থেকে আর কখনো বঞ্চিত না হন।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024