‎র‍্যাব ও সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রেমের ফাঁদে ফেলে স্কুলছাত্রীকে দীর্ঘমেয়াদী ধর্ষণের অভিযোগে পারভেজ ব্যাপারীকে মোংলা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।


‎বাগেরহাটের মোংলা পৌর শহরের বনফুল মিষ্টির দোকানের সামনে থেকে সোমবার দুপুরে পারভেজ ব্যাপারী (২২) নামের এক যুবককে যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার করেছে পিরোজপুর ও মোংলা থানা পুলিশ। মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নিজেকে র‍্যাব ও সেনাবাহিনীর মেজর বা কর্নেল হিসেবে জাহির করে আসছিল এই অভিযুক্ত। পিরোজপুরের কাউখালী থানার উপপরিদর্শক মহিউদ্দিন ও সহকারী উপপরিদর্শক খায়রুল হাসানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পারভেজের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। খুলনার কয়রা এলাকার সাখাওয়াত ব্যাপারীর ছেলে পারভেজ দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে পিরোজপুরের এক স্কুলছাত্রীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং পরবর্তীতে ভুয়া বিয়ের নাটক সাজিয়ে তাকে নিয়মিত ধর্ষণ করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।


‎ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবার ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত পারভেজ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে নিজেকে একজন দুর্ধর্ষ ও প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করে কিশোরীর বিশ্বাস অর্জন করেছিল। এই ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে সে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভুক্তভোগীকে নিয়ে রাত্রিযাপন করেছে, যা সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চরম পর্যায়কে নির্দেশ করে। ভুক্তভোগীর মা নিলুফা বেগমের দায়ের করা মামলার তথ্য অনুযায়ী, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর অভিযুক্ত পারভেজ খুলনা থেকে পালিয়ে মোংলায় আত্মগোপন করেছিল। ভুক্তভোগী কিশোরীর ওপর এই প্রতারণা ও শারীরিক নির্যাতনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী, যা কেবল একটি আইনি অপরাধ নয় বরং প্রযুক্তির অপব্যবহার করে একজন নাবালিকার জীবন ধ্বংসের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।


‎কাউখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অভিযুক্তকে পিরোজপুরে স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ও পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, পারভেজ কেবল এই স্কুলছাত্রীই নয়, বরং একই কৌশলে আরও অনেক নারীকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলেছিল। এই চক্রের পেছনে অন্য কোনো শক্তিশালী মদদদাতা বা নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ এখন ব্যাপক তদন্ত চালাচ্ছে। অপরাধী পারভেজের বিরুদ্ধে ধর্ষণের পাশাপাশি প্রতারণার সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিকে জোরালো করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর নজরদারি বাড়ানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে কেউ প্রযুক্তির অপব্যবহার করে এমন জঘন্য অপরাধ করতে না পারে।


‎এই ঘটনাটি ডিজিটাল যুগে সাইবার নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতার অভাবকে প্রকটভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। শুধুমাত্র প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে কাউকে বিশ্বাস করার পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা এই মামলার মাধ্যমে স্পষ্ট। ভুক্তভোগীর জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতির দায়ভার কে নেবে, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এআই প্রযুক্তি ও ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যে অপরাধমূলক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে, তার মূলোৎপাটন করতে না পারলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে উঠতি বয়সী তরুণীরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে থাকবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ডিজিটাল লিটারেসি বৃদ্ধির মাধ্যমেই কেবল এই ধরনের সামাজিক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।


প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024