মিচেল স্টার্ক যখন বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে ছিন্নভিন্ন করছিলেন, তখন হয়তো অস্ট্রেলিয়া ভেবেছিল ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনটা তাদের জন্য একতরফা আনন্দেরই হবে। ২২ বলের মধ্যে পাঁচ উইকেট, শেষ পর্যন্ত ছয় শিকার-স্টার্কের আগুনে বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় মাত্র ৬৪ রানে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সে স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দিলেন না শরিফুল ইসলাম।


ব্যাট হাতে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১৪ রান করার পর বল হাতে যেন অন্য এক শরিফুলকে দেখা গেল। চোট কাটিয়ে একাদশে ফেরা বাঁহাতি এ পেসারের তোপে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপও বারবার কেঁপে উঠেছে। প্রথম দিন শেষে ৮ উইকেটে ১৬৫ রান নিয়ে মাঠ ছেড়েছে স্বাগতিকরা। বাংলাদেশের বিপক্ষে তাদের লিড ১০১ রান হলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া।


বাংলাদেশের ৬৪ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই স্বস্তিতে ছিল না অস্ট্রেলিয়া। তাসকিন আহমেদের বলে ম্যাট রেনশ ৮ রানে ফিরলে ২২ রানে প্রথম উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। এরপর বল হাতে নিজের প্রথম স্পেলেই ম্যাচের রং বদলে দেন শরিফুল। অষ্টম ওভারে এসে প্রথমে ট্র্যাভিস হেডকে ২২ রানে বোল্ড করেন তিনি। চার বল পর মার্নাস লাবুশেনকেও ফেরান মাত্র ৪ রানে। ৪১ রানেই তিন উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া তখন চাপে।


তবে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন স্টিভ স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন। চতুর্থ উইকেটে দুজনের ৭৭ রানের জুটি অস্ট্রেলিয়াকে বিপদমুক্ত করার পথ দেখায়। বাংলাদেশকে ফের চাপে ফেলার মুহূর্তে জুটি ভাঙেন সে শরিফুলই। ৭৪ বলে ৪২ রান করা স্মিথকে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলেন তিনি। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক; আম্পায়ার্স কলে সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।


স্মিথ ফেরার পর অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে আবারও নামে ধস। মেহেদী হাসান মিরাজের বলে অ্যালেক্স ক্যারি ৫ রানে ফিরে যাওয়ার পর মাত্র তিন রানের মধ্যে চার উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। আর সে ধসের মূল কারিগর হয়ে ওঠেন শরিফুল।


পরপর বেউ ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ককে ফিরিয়ে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন তিনি। ওয়েবস্টার গোল্ডেন ডাক মেরে ফেরেন এলবিডব্লিউ হয়ে। রিভিউ নিয়েও সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেননি তিনি। এরপর কামিন্সকে লিটন দাসের ক্যাচ বানান শরিফুল। দুই বল পর বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে বড় কাঁটা স্টার্ককেও বোল্ড করে দেন তিনি।


মাত্র পাঁচ বলের মধ্যে তিন উইকেট। আর স্টার্কের পর স্টার্ককেই যেন জবাব দিলেন শরিফুল। বাংলাদেশের ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়া অস্ট্রেলিয়ান পেসারকে নিজের ষষ্ঠ শিকার বানিয়ে ম্যাকাইয়ের প্রথম দিনটাকে দুই পেসারের ব্যক্তিগত লড়াইয়ে পরিণত করেন বাংলাদেশের এ বাঁহাতি।


শেষ পর্যন্ত ১১ ওভারে ৩৫ রান দিয়ে ছয় উইকেট নিয়ে দিন শেষ করেছেন শরিফুল। প্রথম দিন পতন হওয়া ১৮ উইকেটের ১২টিই গেছে স্টার্ক ও শরিফুলের শিকার হিসেবে। দুই পেসারের এমন দাপটে ব্যাটারদের জন্য ম্যাকাইয়ের পিচ যেন হয়ে উঠেছে আতঙ্কের জায়গা।


অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম ক্যামেরন গ্রিন। এক প্রান্ত আগলে রেখে ৮টি বাউন্ডারিতে ৫১ রানে অপরাজিত আছেন তিনি। নাথান লায়ন ১০ রানে তাকে সঙ্গ দিচ্ছেন। দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটি এখন পর্যন্ত ১৭ রান যোগ করেছে।


বাংলাদেশের জন্য অবশ্য পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশার নয়। ৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পরও অস্ট্রেলিয়াকে আটকে রাখার সুযোগ তৈরি করেছে বোলাররা। প্রথম ইনিংসে ১০১ রানের লিড নিয়েও তাই প্যাট কামিন্সের দলের নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই।


দিনের গল্পটা যেন দুই পেসারের। শুরুতে স্টার্কের আগুনে বাংলাদেশের ব্যাটিং পুড়েছে, পরে সে আগুনই শরিফুল ফিরিয়ে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে। এখন দ্বিতীয় দিনের অপেক্ষা-গ্রিন কি অস্ট্রেলিয়ার লিড আরও বাড়াবেন, নাকি শরিফুলের আগুনে আবারও পুড়বে স্বাগতিকদের শেষ দুই উইকেট?

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024