|
Date: 2026-08-19 09:33:04 |
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার কসবামাজাইল ও পাট্টা ইউনিয়নের দুটি গ্রামের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এ বিরোধের জেরে একের পর এক হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও চুরির ঘটনায় আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন কসবামাজাইল ইউনিয়নের বাংলাট গ্রামের সাধারণ মানুষ। এরই ধারাবাহিকতায় অটো রাইস মিলের দুটি মোটর চুরির অভিযোগে স্থানীয় জনতার হাতে আটক হওয়ার পর গণপিটুনিতে আহত এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে কসবামাজাইল ইউনিয়নের বাংলাট গ্রাম ও পাট্টা ইউনিয়নের মাজাইল গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি অবস্থিত দুটি গ্রামের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। ওই সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং বিষয়টি বর্তমানে মামলাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই ঘটনার পর থেকে বাংলাট গ্রামের বিভিন্ন বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে থাকে। এতে অনেক পরিবার নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিজ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করতে বাধ্য হন বলে স্থানীয়রা জানান।
পরিস্থিতি পরিদর্শনের পর রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ হারুনুর রশিদ সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বলেন, যাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, তারা যেন কোনো ধরনের ভয় বা দ্বিধা না করে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে বসবাস শুরু করেন এবং এ ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা হবে না। এরপর কয়েকজন সাধারণ মানুষ নিজ এলাকায় ফিরে এসে বসবাস শুরু করলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, পরবর্তীতে তাদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ ও হয়রানি বাড়তে থাকে।
এর মধ্যেই গত রাতে বাংলাট গ্রামের মোহাম্মদ করিম হোসেনের অটো রাইস মিলে চুরির ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের দাবি, পাট্টা ইউনিয়নের মাজাইল গ্রামের বাসিন্দা জজ আলীসহ কয়েকজন ব্যক্তি রাইস মিলের দুটি মোটর খুলে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনতার হাতে আটক হন। পরে উত্তেজিত জনতা তাদের মারধর করে। খবর পেয়ে পাংশা মডেল থানার পুলিশ সদস্যরা দুটি গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
পুলিশ আহত অবস্থায় জজ আলীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য পাংশা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনাটির সঙ্গে কারা জড়িত—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জজ আলী পাট্টা ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মোঃ আকিদুলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় চুরি ও মাদক কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ স্থানীয়দের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং তিনি পূর্বে কোনো অপরাধে জড়িত ছিলেন কি না, তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট মামলার নথির মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাট গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে চুরি, হামলা, লুটপাট ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আশঙ্কায় তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। রাতের বেলায় বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন অনেকে। স্থানীয়দের দাবি, দুই গ্রামের দীর্ঘদিনের বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে একজনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যাতে নতুন করে কোনো সংঘর্ষ বা প্রতিশোধমূলক হামলার ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই বিরোধ নিরসনে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নেবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বাংলাট ও মাজাইল গ্রামের মধ্যে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে।
তবে গত রাতের গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনায় কারা জড়িত, চুরির অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা কী এবং সংঘর্ষের পেছনে কারা ইন্ধন দিচ্ছে—এসব বিষয় তদন্ত শেষে পরিষ্কার হবে।
© Deshchitro 2024