|
Date: 2026-08-14 19:52:13 |
মোংলা প্রতিনিধিঃ
সুন্দরবন বন বিভাগের কঠোর নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিয়মিত অভিযানের ফলে বন্যপ্রাণী শিকার, বিশেষ করে হরিণ শিকার এবং বিষ দিয়ে মাছ ধরার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে বনরক্ষীদের নিরলস প্রচেষ্টা, যেমন - নিয়মিত ফুট পেট্রোলিং, স্মার্ট পেট্রোলিং, বোট পেট্রোলিং, দিন-রাত ঝটিকা অভিযান এবং আধুনিক ড্রোন ব্যবহার করে নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফলে সুন্দরবনের বনজ সম্পদ ধ্বংসকারী চক্র ও চোরা শিকারিদের অপতৎপরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। এর প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ, হরিণসহ বন্যপ্রাণী শিকার এবং বিষ দিয়ে মাছ ধরার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অতীতের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এই কঠোর নজরদারির কারণে এখন সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ে দুই হাজার টাকা কেজিতেও হরিণের মাংস দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে, যা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের পুনরুজ্জীবনের এক স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। বন বিভাগের পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যাতত্ত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং মাঠ পর্যায়ে সরেজমিনে তদন্তেও এই চিত্র স্পষ্ট। প্রায় ১৫ মাস পূর্বেও সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ে গরু বা খাসির মাংসের চেয়ে কম দামে হরিণের মাংস বিক্রি হতো, এমনকি চামড়াসহ হরিণ নিয়ে চোরা শিকারিরা শহরের ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতো। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে, যা বন বিভাগের কার্যকর ভূমিকারই প্রতিফলন।
বনরক্ষীদের এই কঠোর তৎপরতা বন অপরাধীদের দৌরাত্ম্যকে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। বিগত বছরের তুলনায় চলতি বছর পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে বিষ দিয়ে মাছ শিকার এবং বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে হরিণ শিকারের ঘটনা কমে এসেছে। চলতি বছর সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ তিন মাসের মধ্যে, অর্থাৎ জুন, জুলাই এবং ১৩ আগস্ট পর্যন্ত পূর্ব সুন্দরবনে বনরক্ষীদের সক্রিয়তার কারণে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়ে বনরক্ষীরা ৩,২১৪টি অভিযান পরিচালনা করে ৪টি মামলা (ইউডিওআর) দায়ের করেছেন। এই অভিযানগুলোতে তারা অসাধু চক্রের ব্যবহৃত ১৩টি নৌকা, ৬টি মাছ ধরার জাল এবং ৩২ বোতল, ২ লিটার তরল ও ৩ প্যাকেটজাত বিষ, ১৫১.৫ কেজি বিষযুক্ত চিংড়ি এবং ২ বস্তা শুঁটকি চিংড়ি ও ৫ কেজি শুঁটকি মাছ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। এর বিপরীতে, গত বছর একই সময়ে (১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট, ২০২৫) মাত্র ৮টি মামলায় ৫ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং ২৭টি নৌকা, ২১টি জাল, ৫২ বোতল ও ৫ লিটার বিষ, ২৪৫ কেজি বিষযুক্ত মাছ, ১৪৫ কেজি বিষযুক্ত চিংড়ি, ১৭৭ কেজি সাদা মাছ এবং ২২ বস্তা শুঁটকি চিংড়ি উদ্ধার করা হয়েছিল। এই তুলনামূলক চিত্র স্পষ্ট করে যে, চলতি বছরে অপরাধ দমনে বন বিভাগের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
অপরদিকে, চলতি বছর সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ তিন মাসের মধ্যে জুন, জুলাই এবং ১৩ আগস্ট পর্যন্ত পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে হরিণ শিকার রোধেও বড় ধরনের সফলতা এসেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই সময়ে ৯ জন শিকারিকে গ্রেফতার করে ৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই সময়ে কোনো হরিণের মাংস, চামড়া বা মৃত হরিণ উদ্ধার হয়নি। একই সময়ে, হরিণ শিকারিদের পাতা ১৪,৩৮১ ফুট মালা ফাঁদ, ১১০টি ছিটকা ফাঁদ, ৪৬ ফুট হাটা ফাঁদ ও ৬৯টি ডোয়া ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি, ২টি নৌকা ও ৩টি ট্রলারও আটক করা হয়। এর বিপরীতে, গত বছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে ২০টি মামলায় ১২ জন শিকারিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তখন ১৫৬.৫ কেজি হরিণের মাংস, ৫টি মাথা, ৮টি পা, ২টি চামড়া ও ২টি মৃত হরিণ উদ্ধার করা হয়েছিল। এছাড়া, ওই সময়ে উদ্ধার করা ফাঁদের পরিমাণও ছিল বহুগুণ বেশি, যার মধ্যে ছিল ৩৩,৭০৩ ফুট মালা ফাঁদ, ২৫৮টি ছিটকা ফাঁদ, ১,৫০৫ ফুট হাটা ফাঁদ ও ২৫ ফুট গলা ফাঁদ এবং ৯টি নৌকা ও ৬টি ট্রলার জব্দ করা হয়েছিল। এই পরিসংখ্যানগত পার্থক্য প্রমাণ করে যে, বন বিভাগের নিবিড় নজরদারি ও কার্যকর অভিযানের ফলে হরিণ শিকারের ঘটনা ব্যাপক হারে কমে এসেছে।
সুন্দরবন সুরক্ষায় নিয়োজিত সাংবাদিক সংগঠন, সুন্দরবন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মনিরুজ্জামান নাসিম আলী জানান, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য পূর্বের চেয়ে উন্নত অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বনাঞ্চলে গত এক বছরের অধিক সময় ধরে সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফলে বন অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। তিনি আরও বলেন যে, বনজ সম্পদ ধ্বংসকারী চক্র, বিশেষ করে চোরা শিকারি ও বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং পূর্ব সুন্দরবন সন্নিহিত লোকালয়ে এখন আর হরিণের মাংস পাওয়া যায় না। তিনি পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের মতো পশ্চিম বিভাগেরও সার্বক্ষণিক নিবিড় নজরদারিতে আনার আহ্বান জানান। পাশাপাশি, তিনি বনরক্ষীদের শূন্য পদ পূরণ, দ্রুতগতির নৌযানের ব্যবস্থা, আরও অধিক ড্রোন ব্যবহার এবং জেলে-বনজীবীদের নৌযানে জিপিএস ট্রাকিংয়ের আওতায় আনার দাবি জানান। বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন যে, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বন বিভাগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার ও প্রযুক্তি নির্ভর। তিনি জানান, পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে দুর্গম বনাঞ্চলে বনরক্ষীরা নিয়মিতভাবে ফুট পেট্রোলিং, স্মার্ট পেট্রোলিং, বোট পেট্রোলিংসহ দিন-রাত ঝটিকা অভিযান ও আধুনিক ড্রোন উড়িয়ে নিবিড় নজরদারি পরিচালনা করছেন। প্রায় ১৫ মাসের এসব অভিযানের ফলেই হরিণ শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারী অসাধু চক্রের তৎপরতা অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে। এই অপরাধের নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রাখতে ১লা সেপ্টেম্বর থেকে আরও কঠোর অভিযান ও আধুনিক নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
© Deshchitro 2024