|
Date: 2026-08-14 05:16:21 |
সাংবাদিকতা একটি মহান ও দায়িত্বশীল পেশা। সমাজের অসংগতি, অন্যায়-অবিচার, অনিয়ম-দুর্নীতি এবং মানুষের সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরে জনমত গঠন ও সত্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন সাংবাদিকরা। তাই সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
সহনশীলতার চর্চা করা :
পেশাগত জীবনে মতের পার্থক্য, ভুল বোঝাবুঝি, ব্যক্তিগত অভিমান কিংবা নানা ধরনের পরিস্থিতিতে রাগ-ক্ষোভ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এসব বিষয়কে দীর্ঘস্থায়ী করে রাখা কোনোভাবেই কল্যাণকর নয়। বরং সাংবাদিকদের বৃহত্তর স্বার্থে ব্যক্তিগত রাগ, অভিমান, অহংবোধ ও হিংসাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ঐক্য, সম্প্রীতি ও সহযোগিতার পথে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
সত্য প্রকাশের দায়বদ্ধতাই সাংবাদিকতার বড় শক্তি :
একজন সাংবাদিকের শক্তি কেবল তাঁর কলম, ক্যামেরা কিংবা সংবাদ প্রকাশের সক্ষমতায় নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সাহস। সেই জায়গা থেকেই সাংবাদিক সমাজকে নিজেদের মধ্যকার বিভেদ ও দূরত্ব কমিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে হবে।
ব্যক্তিগত অভিমান যেন পেশাগত সম্পর্ক নষ্ট না করে :
সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে প্রতিদিন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। একইসঙ্গে সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়। এ কারণে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, রাগ-অভিমান বা মতবিরোধকে পেশাগত সম্পর্কের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া উচিত নয়।
কারও বক্তব্য বা আচরণে কষ্ট পেলে তা নিয়ে দীর্ঘদিন বিরূপ মনোভাব পোষণ না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা যেতে পারে। কারণ একজন সহকর্মীর সঙ্গে আজকের মতবিরোধ আগামী দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকে নষ্ট করে দিতে পারে।
ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজ সময়ের দাবি :
বর্তমান সময়ে সাংবাদিকদের সামনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ, মানুষের অধিকার তুলে ধরা এবং সমাজের অনিয়ম-অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিক কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী না হওয়া :
কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নন-বরং সবাই একই পেশার সহযাত্রী। একটি ভালো সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে একজন সাংবাদিক যেমন সমাজের উপকার করেন, তেমনি অন্য একজন সাংবাদিকের ইতিবাচক কাজও পুরো সাংবাদিক সমাজের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
তাই একে অপরকে ছোট করা, হেয় করা কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসার পরিবর্তে ভালো কাজকে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনের সময় সহকর্মীর পাশে দাঁড়ানোই হতে পারে একজন প্রকৃত সাংবাদিকের পরিচয়।
মানবিকতাই হোক সাংবাদিকতার অন্যতম ভিত্তি:
সাংবাদিকরা মানুষের কথা বলেন। মানুষের অধিকার, অসহায়ত্ব, দুঃখ-কষ্ট, বঞ্চনা ও প্রত্যাশার কথা সমাজের সামনে তুলে ধরেন। তাই সাংবাদিকদের নিজেদের আচরণেও মানবিকতার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
সত্যকে সামনে তুলে আনার সাহস :
রাগের মুহূর্তে বলা একটি কথা যেমন সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে, তেমনি ভালোবাসা ও সহমর্মিতার একটি কথাই অনেক দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে। তাই অহংবোধকে পাশে রেখে ক্ষমা করার মানসিকতা, ভুল স্বীকার করার সাহস এবং অন্যের অবস্থানকে বোঝার চেষ্টা সাংবাদিক সমাজকে আরও সুন্দর ও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
হিংসা নয়, সহকর্মীর সাফল্যে আনন্দ:
একজন সাংবাদিক ভালো কাজ করলে তাঁর প্রশংসা করা উচিত। কেউ নতুন দায়িত্ব পেলে তাকে শুভেচ্ছা জানানো উচিত। কারও সংবাদ পাঠকের কাছে প্রশংসিত হলে সেটিকে নিজের জন্য হুমকি হিসেবে না দেখে সাংবাদিকতার সামগ্রিক সাফল্য হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
কারণ একজনের সাফল্য অন্যজনের ব্যর্থতা নয়। বরং ভালো কাজের মাধ্যমে একজন পথ দেখালে অন্যরা সেই পথ অনুসরণ করে আরও ভালো কাজ করতে পারেন। এভাবেই একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা সাংবাদিকতার মানকে আরও উন্নত করতে পারে।
আসুন, সম্পর্কগুলোকে আরও সুন্দর করি :
জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। এই অল্প সময়ের পথচলায় রাগ, অভিমান, অহংবোধ ও হিংসাকে আঁকড়ে ধরে থাকার কোনো অর্থ নেই। ভুল বোঝাবুঝি থাকতেই পারে, মতের অমিলও থাকতে পারে; কিন্তু সম্পর্ক নষ্ট করে নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আলোচনার মাধ্যমে সেই দূরত্ব কমিয়ে আনা সম্ভব।
আসুন, আমরা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও অহংবোধের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতাকে হৃদয়ে ধারণ করি। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই, সহকর্মীর বিপদে পাশে দাঁড়াই এবং ভালো কাজে উৎসাহ দিই। রাগ-অভিমানকে পেছনে ফেলে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের বন্ধনে নিজেদের পথচলাকে আরও সুন্দর করে তুলি।
সাংবাদিকতার মূল শক্তি সত্য, ন্যায় ও মানবিকতা। আর সেই মানবিকতার চর্চা যদি সাংবাদিক সমাজের নিজেদের মধ্য থেকেই শুরু হয়, তাহলে শুধু পারস্পরিক সম্পর্কই সুন্দর হবে না-সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থাও আরও গভীর হবে।
তাই আসুন-রাগ নয়, ভালোবাসা; অহংকার নয়, বিনয়; হিংসা নয়, সহমর্মিতা এবং বিভেদ নয়, ঐক্যকে ধারণ করি।
অনেক ধন্যবাদ ও আন্তরিক শুভকামনা। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন-সবসময়।
কারণ, ভালোবাসা ও মানবিকতার স্পর্শেই জীবন সত্যিই সুন্দর।
লেখক : প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু নাছের
সহ-সভাপতি,
নোয়াখালী সাংবাদিক ইউনিয়ন ও
সভাপতি,
সেনবাগ উপজেলা প্রেসক্লাব
সেনবাগ, নোয়াখালী।
© Deshchitro 2024