|
Date: 2026-08-09 21:53:07 |
মোংলা প্রতিনিধিঃ
বাগেরহাটের রামপালে অভাবের তাড়নায় মাথার চুল বিক্রি করা রেহানা খাতুনের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন; প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলামের নির্দেশে প্রদান করা হয়েছে নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তা।
বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের বাসিন্দা রেহানা খাতুন অভাবের চরম বাস্তবতায় নিজের মাথার চুল বিক্রি করে দিয়ে যে সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছিলেন, তার প্রেক্ষিতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকারি প্রশাসন। গত ৯ আগস্ট রবিবার বিকেলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলামের সরাসরি নির্দেশনায় রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না ফেরদৌসী ভুক্তভোগী রেহানা খাতুনের অস্থায়ী ঠিকানায় উপস্থিত হন। রেলপথের পাশে সরকারি জমিতে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করা এই নারীর পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে তাৎক্ষণিকভাবে তার হাতে এক মাসের খাদ্যসামগ্রী এবং নগদ অর্থ তুলে দেওয়া হয়। প্রতিমন্ত্রী কর্তৃক প্রেরিত এই সহায়তা কার্যক্রমে স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে অপু রায়হান ও আলমগীর হোসেন উপস্থিত ছিলেন, যারা সরাসরি ভুক্তভোগীর হাতে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেন। মূলত চরম দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে না পেরে রেহানা খাতুন নিজের মাথার চুল কেটে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন, যা সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ওপর এক বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।
ভুক্তভোগী রেহানা খাতুনের এই করুণ কাহিনী গত ৮ আগস্ট শনিবার প্রতিমন্ত্রীর নজরে আসার পরই প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র অভাবের সাথে লড়াই করা এই নারীর জীবনচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি সরকারি খাস জমিতে কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিলেও নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস না থাকায় মৌলিক চাহিদাই পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তার এই চুল বিক্রির ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং গ্রামীণ জনপদে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির কার্যকারিতা ও প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাবকেই স্পষ্ট করে তোলে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, অভাবের তাড়নায় চুল বিক্রির মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া একজন নারীর জন্য কতটা মানসিক ও সামাজিক যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে, তা তার দৈনন্দিন পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রেহানা খাতুনের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে তাকে কেবল তাৎক্ষণিক ত্রাণ দিয়েই দায় সারা হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
ঘটনাটির পরিপ্রেক্ষিতে রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না ফেরদৌসী জানান, প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের পক্ষ থেকে দ্রুত সাড়া দেওয়া হয়েছে এবং ভুক্তভোগীর পুনর্বাসনের জন্য জোরালো নির্দেশনা রয়েছে। তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন যে, রেহানা খাতুনকে গৌরম্ভা আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি স্থায়ী ঘর বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে, যা তাকে ভূমিহীন জীবনের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দেবে। প্রশাসনের এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো শুধুমাত্র খাদ্য সহায়তা দেওয়া নয়, বরং তাকে স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি প্রশাসনের এই ত্বরিত পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে এসেছে, তবে এই ধরনের প্রান্তিক মানুষের তালিকা তৈরি করে তাদের নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনায় সাড়া না দিয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এ ধরনের দারিদ্র্যপীড়িত ব্যক্তিদের মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
রেহানা খাতুনের এই ঘটনাটি দেশের পরিবহন ও জনপদ সংলগ্ন সরকারি জমিগুলোতে বসবাসকারী ছিন্নমূল মানুষের জীবনযাত্রার একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি মাত্র। চরম দারিদ্র্যের কারণে চুল বিক্রির মতো চরম ও মর্মান্তিক পথ বেছে নেওয়ার ঘটনাটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বড় ধরনের সামাজিক বার্তা। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে স্থানীয় সরকার ও সমাজকল্যাণ বিভাগকে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে যাতে কোনো নাগরিককেই মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য নিজের শরীরের অংশ বিক্রি করতে না হয়। সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে স্থানান্তরের মাধ্যমে রেহানা খাতুনের জীবনের যে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে, তা যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা অন্যদের জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সামগ্রিকভাবে, সরকারি সহায়তার এই ধারা অব্যাহত থাকলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের পথ সুগম হবে এবং সামাজিক নিরাপত্তার বলয় আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
© Deshchitro 2024