বাংলাদেশের আনারসের নাম উঠলেই সবার আগে যে অঞ্চলের কথা মনে আসে, সেটি হলো টাঙ্গাইলের মধুপুর। সুস্বাদু, রসালো সুগন্ধি এই আনারস দেশের সীমানা পেরিয়ে বহুদিন ধরেই পরিচিত। সেই ঐতিহ্যের স্বীকৃতি হিসেবে মধুপুরের আনারস ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের মর্যাদা লাভ করে। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে দেশের কৃষিখাতে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে-জিআই স্বীকৃতির পর সত্যিই কি বদলেছে মধুপুরের আনারস চাষিদের ভাগ্য?

মধুপুরের বিস্তীর্ণ লাল মাটির পাহাড়ি টিলা বনাঞ্চল ঘেরা এলাকাজুড়ে বছরের পর বছর ধরে আনারস চাষ হয়ে আসছে। এখানকার মাটি আবহাওয়া আনারস উৎপাদনের জন্য বিশেষ উপযোগী। ফলে এই অঞ্চলের আনারসের স্বাদ গুণগত মান দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় ভিন্ন। এই বিশেষত্বের কারণেই মধুপুরের আনারস জিআই স্বীকৃতি অর্জন করে

জিআই পণ্যের মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্যময় পণ্যকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং তার বাজারমূল্য বৃদ্ধি করা। এতে উৎপাদকরা ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ পান এবং বিদেশি বাজারে প্রবেশের পথ সহজ হয়। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর মধুপুরের আনারস নিয়ে কৃষক সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার হয়তো আনারসের দাম বাড়বে, কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং বিদেশে রপ্তানির নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে

কিন্তু বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। মধুপুরের অনেক আনারস চাষির মতে, জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পরও মাঠপর্যায়ে তেমন কোনো বড় পরিবর্তন তারা অনুভব করেননি। এখনও বেশিরভাগ কৃষক ক্ষেত থেকেই পাইকারদের কাছে আনারস বিক্রি করেন। বাজার নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে থাকায় কৃষকরা উৎপাদিত পণ্যের প্রকৃত মূল্য পান না

তবে আশার কথা বর্তমান ডাক, টেলিযোগাযোগ তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে আনারসের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনে অন্যতম অর্থকারী ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ঘোষণা দিয়েছেন বারংবার তিনি জুস ফ্যাক্টরি সহ কিভাবে প্রক্রিয়াজাত করা যায় সেই বিষয়ে সংসদেও বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও আনারস বিদেশে রপ্তানি আনারস সংগ্রহ করে রাখার জন্য কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের কথা বলেছেন অপার সম্ভাবনার পাহাড়ী এই ফলটি খেতেও যেমন সুস্বাদু, পুষ্টি গুণে ভরপুর, ভিটামিনও আছে প্রচুর কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এই ফলটি এখন মানুষ সেরকম আবাদ করতে চায় না আবার যা আবাদ করে তা মরণঘাতী ফল হিসেবেও এখন পরিচিত

মধুপুর উপজেলার আনারস চাষি বলেন, জিআই স্বীকৃতির খবর শুনে আমরা খুব খুশি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আনারসের দাম বাড়বে। কিন্তু এখনো আগের মতোই পাইকাররা কম দামে কিনে নিয়ে যায়। আমাদের লাভ খুব বেশি বাড়েনি।

বর্তমানে আনারস চাষের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সার, কীটনাশক, সেচ এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকদের ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি। অন্যদিকে মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আনারস বাজারে আসায় দাম কমে যায়। ফলে অনেক সময় উৎপাদন খরচ উঠিয়ে আনাই কঠিন হয়ে পড়ে

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জিআই স্বীকৃতি পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও এর সুফল পেতে হলে শুধু কাগজে-কলমে স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন কার্যকর ব্র্যান্ডিং, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি বৃদ্ধি। মধুপুরের আনারসকে যদি বিশ্ববাজারে একটি স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে কৃষকরা এর প্রকৃত সুফল পেতে পারেন

তবে ইতিবাচক কিছু পরিবর্তনও চোখে পড়ছে। জিআই স্বীকৃতির ফলে মধুপুরের আনারস দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন কৃষি মেলায় মধুপুরের আনারসকে বিশেষভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে ভোক্তাদের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আনারসের পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়েছে

এছাড়া আনারসভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। আনারসের জুস, জ্যাম, জেলি, ক্যান্ডি শুকনো আনারস উৎপাদনের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন করা সম্ভব। এসব শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফলের জন্য আরও ভালো মূল্য পেতে পারেন। বর্তমানে কিছু উদ্যোক্তা এই খাতে কাজ শুরু করেছেন, যা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক

মধুপুরের আনারসকে কেন্দ্র করে কৃষি পর্যটনেরও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আনারসের মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা মধুপুরে আসেন। সবুজ বাগান, পাহাড়ি পরিবেশ এবং আনারসের সৌরভ পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষি পর্যটনকে সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে

তবে চাষিদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আরও কিছু পদক্ষেপ জরুরি। কৃষকদের সংগঠিত করে সরাসরি বাজারে বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি, হিমাগার নির্মাণ, উন্নত প্যাকেজিং ব্যবস্থা এবং রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সরকার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জিআই পণ্যের প্রচার-প্রচারণায় আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে

বাস্তবতা হলো, জিআই স্বীকৃতি একটি সম্ভাবনার নাম। এটি কোনো পণ্যের মর্যাদা বাড়ায়, পরিচিতি দেয় এবং নতুন বাজারের দরজা খুলে দেয়। কিন্তু সেই সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবমুখী উদ্যোগ

মধুপুরের আনারস আজ দেশের গর্ব। জিআই পণ্যের মর্যাদা সেই গর্বকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তবে চাষিদের মুখে স্থায়ী হাসি ফোটাতে হলে শুধু স্বীকৃতি নয়, তাদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। তখনই বলা যাবে, মধুপুরের আনারসের জিআই স্বীকৃতি সত্যিকার অর্থে বদলে দিয়েছে চাষিদের ভাগ্য। বর্তমানে এই স্বীকৃতি আশার আলো জ্বালিয়েছে, আর সেই আলোকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024