◾মু. সায়েম আহমাদ  || রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব হলো তার নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়া। এই নিরাপত্তা শুধু সীমান্ত রক্ষা বা সন্ত্রাস দমন নয়। নাগরিক যেন নিশ্চিন্তে কথা বলতে পারে, চলাফেরা করতে পারে, রাতে ঘুমাতে পারে, এইসব নিশ্চয়তাই প্রকৃত নিরাপত্তা। কিন্তু বাংলাদেশে আজ সেই নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, গুমের ভয় আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি এখন একটি জাতীয় ভয়াবহ বাস্তবতা।


গুম সম্পর্কে বলতে গেলে একটি শারীরিক অনুপস্থিতির নাম নয়, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক দমন পদ্ধতি। কাউকে গুম করা মানে কেবল একজন মানুষকে সরিয়ে ফেলা নয়, বরং তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং সর্বোপরি সমাজকে এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মধ্যে নিক্ষেপ করা। এই অনিশ্চয়তা কখনো আদালতে দাঁড়ায় না, কখনো ময়নাতদন্তে শেষ হয় না; বরং এটি প্রতিদিন বেঁচে থাকে প্রশ্ন হিসেবে: সে কোথায়? বেঁচে আছে তো?


সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এই আতঙ্ক এখন আর নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনীতি দিয়ে শুরু হলেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের সর্বস্তরে। মানুষ এখন আর শুধু সরকারবিরোধী বক্তব্য দিতে ভয় পায় না; অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট, একটি মন্তব্য, এমনকি ভুল জায়গায় ভুল সময়ে উপস্থিত থাকাও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তাহীনতা যখন এমন সর্বব্যাপী হয়, তখন রাষ্ট্র কার্যত নাগরিকের সঙ্গে এক নীরব দূরত্ব তৈরি করছে বলে মনে করছি।


সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান-এর সঙ্গে ঘটে যাওয়া হেনস্থার ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এখানে ব্যক্তি নাঈম হাসান গুরুত্বপূর্ণ নন; গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতীকটি। একজন জাতীয় দলের খেলোয়াড়। যিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তিনিই যদি প্রকাশ্যে হেনস্থা, ভয়ভীতি ও অপমানের শিকার হন, তাহলে সাধারণ নাগরিক কী বার্তা পায়? বার্তাটি আমার কাছে খুবই সহজ। কারণ , পরিচয়, জনপ্রিয়তা কিংবা অবদান; এখন কিছুই পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। এছাড়াও ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত সরকারের আমলে জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন প্রায় ৬ হাজার ব্যক্তি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত 'গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন' এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১,৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছিল যার মধ্যে ১,৫৬৯টি ঘটনার সত্যতা মিলেছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১,২৮২ জন ফিরে এসেছেন, তবে ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ। 


এই জায়গাটিতেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর একটি মৌলিক সংকট ধরা পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে অবস্থান করে, যদি তাদের ক্ষমতা ব্যবহারের সীমা স্পষ্ট না থাকে, তাহলে নিরাপত্তা বাহিনীই একসময় নিরাপত্তাহীনতার উৎসে পরিণত হয়। গুমের ভয় মূলত এখান থেকেই জন্ম নেয়, যখন নাগরিক জানে না, কোন আইনের আওতায়, কোন প্রক্রিয়ায়, কোন কর্তৃত্বে তাকে তুলে নেওয়া হতে পারে বা হচ্ছে। 


আমরা জানি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিরাপত্তা মানে কেবল শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। কিন্তু যখন গুমের অভিযোগের বিচার হয় না, তদন্তের ফল প্রকাশিত হয় না, কিংবা দায়ীদের নাম অদৃশ্যই থেকে যায়। তখন রাষ্ট্র নিজেই সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে পড়ে। সেই সন্দেহ একসময় আস্থার মৃত্যু ঘটায়, আর আস্থাহীন রাষ্ট্র কেবল কাগজে শক্তিশালী থাকে; বাস্তবে নয়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তাই ই ঘটে চলেছে। 


আমরা যে গুমের কথা বলছি তার সবচেয়ে বড় ক্ষতির দিক হলো ভবিষ্যত প্রজন্ম। কারণ তখন পুরো প্রজন্মটাই বড় হচ্ছে এক ধরনের অদৃশ্য ভয় নিয়ে। তাদের মনোভাবে গেঁথে যাচ্ছে , ভিন্নমত মানেই ঝুঁকি, প্রশ্ন মানেই বিপদ। এই মানসিকতা কোনো রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে না; বরং ভিতরে-ভিতরে ভেঙে দেয়। কারণ ভয় দিয়ে শাসন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না, কিন্তু ভয় সমাজকে দীর্ঘদিন পঙ্গু করে রাখতে পারে। সেইসাথে একটা প্রজন্মকেও দমিয়ে রাখার অপকৌশলের আশ্রয় হিসেবে গড়ে উঠে। 


তাই আজ প্রশ্নটা শুধু “গুম হচ্ছে কি না” তা নিয়ে নয়। বরং , প্রশ্নটা আরও দৃঢ়ভাবে করতে হচ্ছে যে, রাষ্ট্র কি তার নাগরিককে নাগরিক হিসেবে দেখছে, নাকি সন্দেহভাজন হিসেবে? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তবে নিরাপত্তার সব দাবি অর্থহীন। গুমের আতঙ্কে ঢাকা একটি দেশ কখনোই প্রকৃত অর্থে নিরাপদ নয়। নিরাপত্তা তখনই ফিরবে, যখন প্রতিটি নিখোঁজের ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত হবে, প্রতিটি ক্ষমতার অপব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, এবং রাষ্ট্র নাগরিককে ভয় দেখাবে না অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে। বরং, ভরসা দেবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে। নচেৎ, আমাদের প্রশ্নটা থেকেই যাবে, গুমের আতঙ্কে পুরো দেশ, জনগণের নিরাপত্তা আসলে কোথায়?


মু. সায়েম আহমাদ 

কলামিস্ট ও সংগঠক 


প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024